মঠবাড়িয়া প্রতিনিধি রোকনুজ্জামান শরীফ
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আস সালামু আলায়কুম।
গভীর শ্রদ্ধা বিনয় ও গভীর আস্থার সঙ্গে আপনাকে এই খোলা চিঠি লিখছি—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, বরং দক্ষিণ বাংলার লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব ও নীরব কান্না আপনার মানবিক দৃষ্টিতে তুলে ধরার জন্য।
এটি কোনো একক গ্রামের গল্প নয়, এটি কোনো রাজনৈতিক অভিযোগও নয়। এটি একটি জনপদের পনেরো বছরের অবরুদ্ধ জীবনযুদ্ধের বাস্তব দলিল। যেখানে নদী ছিল জীবনের উৎস, সেখানে আজ বাঁধ হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর দেয়াল। যেখানে পানি ছিল আশীর্বাদ, সেখানে আজ সেই পানিই অভিশাপ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
একটি সভ্য রাষ্ট্রে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না—জলাবদ্ধতার কারণে মৃত মানুষকে স্বাভাবিকভাবে দাফন করা যায় না। ইট-বালু দিয়ে উঁচু কবর বাঁধতে হয়। এ দৃশ্য কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো এক নির্মম বাস্তবতা।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামে প্রবাহিত “দোগনা খাল” ও “ভূতা খাল” এ অপরিকল্পিত ৫টি বাঁধ। বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর সংযোগস্থলের ঐতিহাসিক খালসমূহ—যেগুলো দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যাতায়াত ও জীবিকার প্রাণরেখা ছিল—আজ অবৈধ দখল ও বেআইনি বাঁধের কারণে মৃতপ্রায়। সরকারি খাস খাল ভরাট, সংকুচিত ও দখল করে ব্যক্তিস্বার্থে মাছচাষ ও ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, আর শুষ্ক মৌসুমে চরম পানিসংকট—দুটোই একসঙ্গে মানুষের জীবনকে গ্রাস করছে।
চার হাজার একরের বেশি কৃষিজমি বছরের পর বছর অনাবাদি। কৃষক কর্মহীন, মৎস্যজীবী বেকার, পরিবারগুলো জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী। একসময় যে অঞ্চল মাছের রেণু-পোনার স্বর্গ ছিল, আজ সেখানে নীরবতা আর ধ্বংস।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এই সংকট নতুন নয়। গত পনেরো বছরে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ, পানি সম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে বারবার আবেদন করেছে। মানববন্ধন হয়েছে, সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তদন্ত হয়েছে, পরিদর্শন হয়েছে, এমনকি বাঁধ অপসারণের লিখিত নির্দেশনাও রয়েছে। তবুও বাস্তবায়ন হয়নি—কেন হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—জনস্বার্থে কথা বললেই মানুষকে অপরাধী বানানো হয়। প্রভাবশালী মহলের ভয়ে দায়িত্বশীলরা নীরব থাকেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যেন শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়েছে। এটি কি শহীদ জিয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশ?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ঊষার আলোয় উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাবে দেশবাসী এমনটি ভাবছে। এই জনপদের মানুষ শুধু একটি স্বাভাবিক জীবনের অধিকার চায়।তারা কোনো অসম্ভব দাবি করছে না।তারা চায়–
অবৈধ বাঁধ অপসারণ
স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ
প্রয়োজনীয় স্লুইসগেট ও ছোট সেতু নির্মাণ
কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশের পুনরুদ্ধার
এই কাজগুলো বাস্তবায়িত হলে লক্ষাধিক মানুষের জীবন ফিরবে স্বস্তিতে, রাষ্ট্র বাঁচবে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি থেকে, আর প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি একজন মানবিক রাষ্ট্রনায়ক। দুর্যোগে, দুর্দশায়, অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানুষিকতা আপনার মাঝে বিরাজ করছে যা বাংলাদেশ দেখছে। সেই বিশ্বাস থেকেই এই আকুল আবেদন—আপনার সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর নির্দেশনা ছাড়া এই দীর্ঘদিনের অবিচার বন্ধ হবে না।
আর কত বছর অপেক্ষা করবে এই জনপদ?
আর কত কান্না জমলে রাষ্ট্রের চোখ খুলবে?
নীরবতা আর সহ্য করার নাম নয়—কারণ নীরবতাও এক ধরনের অপরাধ।
আপনার মানবিক সিদ্ধান্তই পারে এই অঞ্চলের মানুষকে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাতে।
জনস্বার্থে–
বিনীত শ্রদ্ধা ও আশায়—
আপনার মঙ্গল কামনায়–
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।

Leave a Reply