মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
ইতিহাসে কিছু শব্দ আছে, যা শুধু অভিধানের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না—তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতা, যন্ত্রণা ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। ফ্যাসিস্ট তেমনই একটি শব্দ। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নির্দেশ করলেও, এর গভীরে লুকিয়ে থাকে একটি ভয়ংকর মানসিকতা, একটি শাসনদর্শন, যা মানবিক মূল্যবোধকে নয়—ক্ষমতা, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ফ্যাসিবাদ মূলত একটি চরম ডানপন্থী, স্বৈরাচারী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই মতাদর্শে বিশ্বাসীরা মনে করে, রাষ্ট্র বা নেতা সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। এখানে জনগণ মালিক নয়, বরং শাসিত এক নীরব ভিড়। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি—মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতকে সম্মান, ক্ষমতার জবাবদিহি—সবকিছুই ফ্যাসিবাদের কাছে দুর্বলতা বলে বিবেচিত হয়।
ফ্যাসিস্ট শাসনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো একনায়কতন্ত্র। একজন নেতা, একটি দল বা একটি মতবাদই এখানে চূড়ান্ত। প্রশ্ন করার অধিকার নেই, বিতর্কের সুযোগ নেই। ক্ষমতার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। এই ব্যবস্থায় আইন তৈরি হয় শাসকের স্বার্থে, আর আইন প্রয়োগ হয় বিরোধীদের দমনে। ন্যায়বিচার শব্দটি কেবল বক্তৃতায় থাকে, বাস্তবে তা ক্ষমতার নির্দেশেই বাঁক নেয়।
উগ্র জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদের আরেকটি শক্তিশালী হাতিয়ার। দেশপ্রেম এখানে মানবিক অনুভূতি নয়, বরং এক ধরনের আবেগী অস্ত্র। নিজের জাতি, দল বা মতবাদকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যকে ছোট করা, ঘৃণা করা কিংবা বাদ দেওয়া স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। “আমরা” আর “ওরা”—এই বিভাজন সমাজকে টুকরো টুকরো করে দেয়। মানুষ আর মানুষ হিসেবে বিবেচিত হয় না, সে হয়ে ওঠে হয় সমর্থক, নয় শত্রু।
ফ্যাসিস্ট মানসিকতায় বিরোধী মানেই শত্রু। ভিন্নমত এখানে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তাই বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করতে ব্যবহার করা হয় ভয়, সহিংসতা, মিথ্যা মামলা, অপপ্রচার ও দমনমূলক আইন। কখনো কারাগার, কখনো গুম, কখনো সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়া—সবই বৈধ হয়ে ওঠে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজনে। ধীরে ধীরে সমাজে জন্ম নেয় এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ, যেখানে মানুষ কথা বলার আগে নিজেকেই সেন্সর করতে শেখে।
সামরিকবাদ ফ্যাসিবাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। শক্তির প্রদর্শনই এখানে রাষ্ট্রের মর্যাদা। অস্ত্র, কুচকাওয়াজ, কঠোর শাসন—এসবের মাধ্যমে জনগণকে বোঝানো হয়, রাষ্ট্র শক্তিশালী, প্রশ্নহীন। কিন্তু এই শক্তির আড়ালে চাপা পড়ে যায় মানুষের কান্না, ক্ষুধা ও ন্যায়বঞ্চনার গল্প। নিরাপত্তার নামে স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, আর মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে শৃঙ্খলের সঙ্গে।
ফ্যাসিবাদে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কোনো স্বতন্ত্র মূল্য নেই। ব্যক্তি এখানে রাষ্ট্রের একটি যন্ত্রমাত্র। মত, চিন্তা, সৃজনশীলতা—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় আদর্শের সঙ্গে মিলতে হবে। না মিললে তা সন্দেহজনক, বিপজ্জনক। ফলে সমাজ হারায় তার বৈচিত্র্য, তার প্রাণশক্তি। একরঙা চিন্তা ও বাধ্যতামূলক আনুগত্যই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক।
তবে ফ্যাসিবাদ শুধু শাসকের দোষে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে মানুষের নীরবতায়। যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ চুপ থাকে, যখন ভয়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখনই ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—স্বাধীনতা হঠাৎ করে হারায় না, তা হারায় ধীরে ধীরে, ছোট ছোট আপসের মধ্য দিয়ে।
সহজ ভাষায় বললে, যারা গণতন্ত্রবিরোধী, যারা সহিংসতা ও ভয়কে শাসনের প্রধান অস্ত্র মনে করে, যারা বাক-স্বাধীনতা ও ভিন্নমতকে দমন করতে চায়—তারাই ফ্যাসিস্ট। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটি একটি মানসিকতার নাম, যা মানুষকে নাগরিক থেকে প্রজায় রূপান্তরিত করে।
এই কারণে ফ্যাসিবাদকে চেনা জরুরি, তার বিরুদ্ধে সচেতন থাকা জরুরি। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, যে মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে, সে সমাজই একদিন ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে সহজ শিকার হয়। স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে শুধু শাসকের নয়, নিজের নীরবতার প্রতিও আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে।
গ্রন্হনা-
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।

Leave a Reply