দক্ষিণবঙ্গের অক্সফোর্ড খ্যাত : যেখানে দেশপ্রেম ও ধর্মীয় শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, মাহবুবুর রহমান | গোপালগঞ্জ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার গওহরডাংগা মাদ্রাসা। পূর্ণনাম ‘জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম গওহরডাংগা মাদ্রাসা’। দেশভাগের এক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ আট দশক ধরে কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, বরং দেশপ্রেম ও সমাজসেবার এক অনন্য নজির স্থাপন করে আসছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও পটভূমি
১৯৪৬ সালে প্রখ্যাত আলেমে দীন, মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)—যিনি ‘সদর সাহেব হুজুর’ নামে সমধিক পরিচিত—এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ আমল পরবর্তী সময়ে মুসলিম সমাজে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি তার নিজ গ্রামে এই বিশাল বিদ্যাপীঠ গড়ে তোলেন।
শিক্ষা পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য:
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহারডাঙ্গা, বাংলাদেশ ও সর্বোচ্চ স্তর ‘আল-হাইয়াতুল উলিয়া’-এর অধীনে পরিচালিত হয়। এখানে শিক্ষার প্রধান দিকগুলো হলো:
হিফজুল কুরআন: অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে কুরআন মুখস্থ করার বিভাগ।
কিতাব বিভাগ: প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পর্যন্ত পাঠদান।
ফতোয়া ও গবেষণা: উচ্চতর ইসলামি আইন বা ইফতা বিভাগ।
আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ।
কারিগরি শিক্ষা: শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
সমাজ সংস্কার ও গওহরডাংগার প্রভাব
মাদ্রাসাটি কেবল চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। সদর সাহেব হুজুর প্রণীত ‘খাদেমুল ইসলাম জামাতের’ মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি আর্তমানবতার সেবায় কাজ করে আসছে।
১. অসাম্প্রদায়িক চেতনা: এ প্রতিষ্ঠানটি সবসময় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
২. দেশপ্রেম: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এবং পরবর্তী সময়ে দেশের ক্রান্তিলগ্নে এই মাদ্রাসার আলেমদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
৩. প্রকাশনা: এখান থেকে নিয়মিত ইসলামি সাময়িকী ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, যা জনমনে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে হাফেজ মাওলানা মুফতি রুহুল আমীন সাহেবের দক্ষ পরিচালনায় মাদ্রাসাটি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার সমন্বয় ঘটাচ্ছে। বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই মাদ্রাসায় প্রতি বছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে। মনোরম পরিবেশ, বিশাল মসজিদ এবং সুশৃঙ্খল ছাত্রাবাস মাদ্রাসাটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
উপসংহার
গওহরডাংগা মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি আদর্শিক আন্দোলন। বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষার প্রচার এবং সমাজ সংস্কারে এই মাদ্রাসার অবদান অনস্বীকার্য। সরকারি স্বীকৃতির পর এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ও দায়িত্ব আরও বেড়ে গিয়েছে।
প্রতিবেদকের শেষ কথা: দক্ষিণবঙ্গের এই দ্বীনি মারকাজটি যুগ যুগ ধরে এভাবেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাক—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

Leave a Reply