মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘর, প্রতিটি উঠান, প্রতিটি পথ একসময় ছিল শালীনতা ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরা, বড়দের সম্মান করা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ—এসবই ছিল সামাজিক শৃঙ্খলার অলিখিত নিয়ম। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই চিত্র আজ অনেকাংশে বদলে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রযুক্তির অবাধ বিস্তার আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় গ্রামীণ সমাজে তৈরি হচ্ছে নতুন এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার মাঝেই উঠে এসেছে শিক্ষামন্ত্রীর একটি বক্তব্য, যা সমাজজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বলেছেন—
“সন্ধ্যা হলেই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে পড়ার আওয়াজ শুনতে চাই। ফিরে আসুক আগের দিনগুলো। রাতে কিশোররা অযাচিত ঘোরাঘুরি করলে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।”
এই বক্তব্য নিছক একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; বরং এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। শিক্ষার পরিবেশ, পারিবারিক তত্ত্বাবধান ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন এতে স্পষ্ট। এখানে যেমন আছে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা, তেমনি আছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে ফেরানোর এক ধরনের আহ্বান।
গ্রামে সন্ধ্যার পর পড়ার আওয়াজ শোনার আকাঙ্ক্ষা আসলে একটি সময়কে ফিরে পাওয়ার আকুতি। সেই সময়, যখন হারিকেনের আলোয় বসে পড়াশোনা করত শিশুরা, যখন মা–বাবা সন্তানের বই খাতা দেখে নিশ্চিন্ত হতেন। আজ বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন থাকা সত্ত্বেও সেই মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রে হারিয়ে যাচ্ছে। কিশোর বয়সে লক্ষ্যহীন ঘোরাঘুরি, অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা ও রাতজাগা—এসবই ধীরে ধীরে সামাজিক সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে পুলিশের ভূমিকার প্রসঙ্গ উঠে আসা অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু এটিকে শুধুই আইনশৃঙ্খলার চোখে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এখানে মূলত বার্তাটি হলো—অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্র সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশ এখানে শেষ ভরসা, প্রথম দায়িত্ব নয়। পরিবার যদি সন্তানের খোঁজ রাখে, সমাজ যদি নজরদারি করে, তবে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনই পড়ে না।
তবে এই বক্তব্যের আরেকটি দিকও বিবেচনায় রাখা জরুরি। কিশোররা কেন রাতে বাইরে থাকে? কেন তারা পড়ার টেবিল ছেড়ে পথের মোড়ে, চায়ের দোকানে বা অকারণ আড্ডায় সময় কাটায়? এর পেছনে আছে শিক্ষার মান, বিনোদনের অভাব, খেলাধুলার সুযোগ সংকট, পারিবারিক সময়ের ঘাটতি এবং অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্যজনিত বাস্তবতা। শুধুমাত্র শাসনের কথা বললে সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলা যাবে না।
শিক্ষা মানে শুধু বই মুখস্থ করা নয়; শিক্ষা মানে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা। গ্রামে যদি পাঠাগার থাকে, খেলাধুলার মাঠ থাকে, সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ থাকে—তবে কিশোররা স্বাভাবিকভাবেই ইতিবাচক পথে এগোবে। পড়ার আওয়াজ তখন জোর করে শোনাতে হবে না; তা নিজেই ফিরে আসবে।
এই বক্তব্য তাই আমাদের জন্য একটি আয়নার মতো। এতে আমরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারি না। শুধু সরকার বা পুলিশ নয়, একজন অভিভাবক হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে, একজন প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের ভূমিকা কী—সেই প্রশ্ন সামনে আসে। আগের দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল স্মৃতিচারণ নয়, প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ।
নিরপেক্ষভাবে বললে, শিক্ষামন্ত্রীর কথায় উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনি আছে আশাবাদ। উদ্বেগ—কারণ সমাজের একটি অংশ সঠিক পথে নেই। আশাবাদ—কারণ এখনো বিশ্বাস করা হচ্ছে, পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। পড়ার আওয়াজ, শৃঙ্খলা ও মানবিক সমাজ—এই তিনটি একে অপরের পরিপূরক।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, এই বক্তব্য আমাদের কানে নয়, হৃদয়ে ধারণ করার মতো। এটি কাউকে ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং সবাইকে জাগিয়ে তোলার জন্য। যদি আমরা সত্যিই চাই আগের দিনগুলো ফিরুক, তবে শুরুটা করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। তখন হয়তো একদিন সত্যিই গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়ি থেকে আবার শোনা যাবে সেই কাঙ্ক্ষিত পড়ার আওয়াজ—নীরব, কিন্তু গভীর প্রত্যয়ে ভরা।
গ্রন্হনা-
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।
Leave a Reply