মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
স্বাধীনতা শব্দটি শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জনের নাম নয়; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং সম্মানের প্রতীক। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস এলে আমরা গর্বভরে স্মরণ করি আমাদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের কথা। শহীদদের রক্তে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় পরিচয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু উৎসবের আবহের মাঝেই একটি প্রশ্ন নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়ায়—রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হলেও, ব্যক্তি ও সমাজ হিসেবে আমরা কতটা স্বাধীন?
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদের জাতীয় গৌরব। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একজন নাগরিক যখন ন্যায়বিচার পেতে বাধাগ্রস্ত হন, যখন সেবা পেতে তাকে দুর্নীতি বা জটিলতার কাছে নতি স্বীকার করতে হয়, তখন স্বাধীনতার অনুভূতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
আমাদের সমাজে বহু মানুষ আজও একটি দুর্বল ও জটিল ব্যবস্থার কাছে অসহায়। প্রশাসনিক জটিলতা, অনিয়ম কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, অনৈতিক প্রভাব কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি নাগরিকদের মনে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও অনেকেই মনে করেন, তারা যেন অদৃশ্য এক কাঠামোর কাছে পরাধীন।
এই পরাধীনতা বাহ্যিক শাসনের নয়; বরং এটি একটি মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট। যখন দুর্নীতি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না—মানুষের আত্মবিশ্বাসও নষ্ট করে। একজন তরুণ যখন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, একজন কৃষক যখন ন্যায্য মূল্য পান না, কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যখন ন্যায়সঙ্গত সেবা পেতে সংগ্রাম করেন, তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তবে এই বাস্তবতা শুধুই হতাশার গল্প নয়; এটি আত্মসমালোচনারও সুযোগ। স্বাধীনতা মানে শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও। রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিকদেরও ভূমিকা রয়েছে একটি সুশাসিত সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। আমরা যদি নিয়ম ভাঙাকে সহজ সমাধান হিসেবে গ্রহণ করি, যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকি, তাহলে অজান্তেই আমরা সেই দুর্বল ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করি, যা আমাদের স্বাধীনতার অনুভূতিকে সীমাবদ্ধ করে।
স্বাধীনতার প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে জবাবদিহিতা ও নৈতিকতায়। সৎ প্রশাসন যেমন প্রয়োজন, তেমনি সচেতন নাগরিকও অপরিহার্য। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, দায়িত্বশীলভাবে মত প্রকাশ করে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য এখানেই—এটি শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ার অঙ্গীকারের দিন।
সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণও কম নয়। নতুন প্রজন্ম ক্রমশ সচেতন হচ্ছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হচ্ছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সোচ্চার হচ্ছে। এসব পরিবর্তন প্রমাণ করে, স্বাধীনতার চেতনা এখনও জীবন্ত। প্রয়োজন শুধু এই চেতনাকে বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কোনো একদিনে অর্জিত হয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যায় না; এটি প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবিক মূল্যবোধ চর্চা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব—এসবের সম্মিলিত প্রয়াসেই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া সম্ভব। রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক—তিন পক্ষের সমন্বয় ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।
স্বাধীনতার সত্যিকারের সৌন্দর্য তখনই ফুটে ওঠে, যখন একজন সাধারণ মানুষ নিরাপদ বোধ করেন, নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হন। তাই স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা শুধু আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; এটি হওয়া উচিত আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান—আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারছি, যেখানে সবাই সমান মর্যাদা ও সুযোগ পায়?
শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রশ্নটি রাষ্ট্রের নয়, আমাদের সবার। আমরা যদি ন্যায়, সততা এবং মানবিকতার পথে এগিয়ে যাই, তবে পরাধীনতার অদৃশ্য শৃঙ্খল একদিন ভেঙে যাবে। তখন স্বাধীনতা হবে শুধু ইতিহাসের গৌরব নয়, প্রতিটি মানুষের জীবন্ত বাস্তবতা।
স্বাধীনতার আলো তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা শুধু স্বাধীন দেশের নাগরিক নয়—স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন বিবেক এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজের নির্মাতা হয়ে উঠব।
লেখক ~~সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর
Leave a Reply