মো: জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সেবা প্রদান ও অর্থ আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। জন্মনিবন্ধন থেকে ট্রেড লাইসেন্স, ফি আদায় থেকে ভাউচার, এমনকি চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ না করলে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে জন্মনিবন্ধন ও মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্ধারিত ফির বাইরে জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাগ্রহীতা।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রসিদ ও আদায় রেজিস্টার। নির্ধারিত ফির বাইরে কোনো অর্থ নেওয়া হয়ে থাকলে সেই অর্থ কোন খাতে দেখানো হয়েছে এবং সেবাগ্রহীতাকে যথাযথ রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ট্রেড লাইসেন্সে ৫০০ টাকা আদায়, ভাউচারে ২৭০!
অভিযোগের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে একটি ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫০০ টাকা। অথচ সংশ্লিষ্ট ভাউচারে উল্লেখ রয়েছে ২৭০ টাকা।
অভিযোগটি নথিপত্রে সত্য প্রমাণিত হলে আদায়কৃত অর্থ ও ভাউচারে প্রদর্শিত অর্থের মধ্যে ২৩০ টাকার পার্থক্য থাকে। সেই পার্থক্যের অর্থ কোথায় গেল, কীভাবে হিসাবভুক্ত হয়েছে এবং সরকারি হিসাবে কত টাকা জমা হয়েছে, তা নির্ধারণে নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি পরিষ্কার করতে আদায় রেজিস্টার, ভাউচার, ব্যাংক হিসাব, সরকারি কোষাগারে জমার চালান এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব-নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে গ্রাম পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
অর্থ আদায়ের অভিযোগের পাশাপাশি পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম নিয়মিত ঢাকায় অবস্থান করেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে গ্রাম পুলিশ রুবেলের মাধ্যমে পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
একজন গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কী ধরনের অনুমোদন বা দায়িত্ব অর্পণের আদেশ রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জন্মনিবন্ধনের ১৫০ টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রাম পুলিশ রুবেল জানান, কাগজপত্রের জন্য ৫০ টাকা চাওয়া হয় এবং চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫০ রাখা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে ১৫০ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁর দাবি, প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই টাকা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মারুফের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, ক্ষেত্রবিশেষে ভাউচারের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আনা হলে তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই—বিন্নাটি ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিকদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা আদায় হচ্ছে, কত টাকা ভাউচারে দেখানো হচ্ছে এবং আদায়কৃত অর্থের পুরোটা সরকারি হিসাবে জমা হচ্ছে কি না?
আর চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ সত্য হলে, তার প্রশাসনিক অনুমোদন বা দায়িত্ব অর্পণের লিখিত ভিত্তিই বা কোথায়?
অভিযোগের সত্যতা কিংবা অসত্যতা নির্ধারণের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ হলো নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত। তাই ইউনিয়ন পরিষদের আদায় রেজিস্টার, ভাউচার, ব্যাংক হিসাব, সরকারি কোষাগারে জমার চালান, দায়িত্ব অর্পণের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট সব নথি পরীক্ষা করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতারা।
অভিযোগগুলো বাস্তব অনিয়ম, নাকি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ভুল—নথি যাচাই ও তদন্তেই মিলবে তার সুনির্দিষ্ট উত্তর।

Leave a Reply