লেখক ~সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। আর জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সময়মতো, সহজে এবং সম্মানের সঙ্গে সেবা পাওয়া। একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো সরকারি দপ্তরের দরজায় যান, তখন তিনি কোনো অনুগ্রহ চাইতে যান না; তিনি তার ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সেবা পেতে যান। অথচ বাস্তবতার নানা স্তরে সেই সহজ প্রত্যাশাটিই অনেক সময় হয়ে ওঠে দীর্ঘ অপেক্ষা, দৌড়ঝাঁপ, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক যন্ত্রণার কারণ।
মাঠপর্যায়ের সরকারি অফিসে গিয়ে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা কি সত্যিই কাগজে-কলমে লেখা সেবার সঙ্গে মেলে? এই প্রশ্নটি আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
পর্যায়ক্রমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি কখনো নিজের পরিচয় গোপন রেখে, সাধারণ মানুষের মতো করে মাঠপর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোতে ঘুরে দেখতেন, তাহলে হয়তো জনসেবার বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্টভাবে চোখে পড়ত। পরিচয় প্রকাশ পেলে যে ব্যবহার পাওয়া যায়, পরিচয় না জানালে সেই ব্যবহার কেমন—এই পার্থক্যটিও হয়তো বোঝা যেত।
একজন সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একটি কাজের পেছনে ঘুরছেন। আজ আসুন, কাল আসুন—এমন আশ্বাস শুনতে শুনতে কখন যে তিন-চার মাস, কখনো তারও বেশি সময় পার হয়ে যায়, তার হিসাব থাকে না। একটি কাজের স্বাভাবিক সময়সীমা কত, তা অনেকেই জানেন না। আর জানলেও সেই সময়সীমা বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এমন—এ কথা অবশ্যই বলা যাবে না। সরকারি ব্যবস্থায় অসংখ্য সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যারা মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়, কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের ধরন, সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে আচরণ এবং কাজের দীর্ঘসূত্রতা পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সবচেয়ে কষ্টের জায়গাটি হলো—অনেক সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সরকারি অফিসে কাজ করাতে হলে পরিচিতি, তদবির কিংবা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, নিয়মের কাজও নানা অজুহাতে জটিল করে তোলা হয়; প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজপত্রের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে না জানিয়ে বারবার ঘোরানো হয়। আবার কেউ প্রশ্ন করলে সমস্যার সমাধান সহজ হওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়—এমন অভিযোগও শোনা যায়।

যদি এসব অভিযোগের কোনো অংশও সত্য হয়, তাহলে তা শুধু একটি অফিসের সমস্যা নয়; এটি জনসেবার প্রতি মানুষের আস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।
একজন দরিদ্র কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা একজন অসহায় বৃদ্ধ যখন সরকারি অফিসে যান, তখন তার প্রতিটি যাতায়াতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ ও সময়ের ক্ষতি। একদিন অফিসে যাওয়া মানে তার একদিনের কাজের ক্ষতি। বারবার যেতে হলে সংসারের ওপর তার চাপ আরও বাড়ে। শহরের একজন মানুষের জন্য যে অপেক্ষা হয়তো সামান্য অসুবিধা, গ্রামের একজন দরিদ্র মানুষের জন্য সেটিই হতে পারে বড় বোঝা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো—ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কোনো বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা জারি হওয়ার পরও যদি তা নিচের স্তরে গুরুত্ব না পায়, ফাইল পড়ে থাকে, চিঠির যথাযথ অনুসরণ না হয়, তাহলে সেই নির্দেশনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়।
অথচ একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে প্রশাসনের প্রতিটি স্তর একই রাষ্ট্রের অংশ। তিনি জানেন না কোন ফাইল কোথায় আটকে আছে, কোন কর্মকর্তা দায়িত্বপ্রাপ্ত, কোন টেবিলে কতদিন পড়ে আছে। তিনি শুধু জানেন—তার কাজ হচ্ছে না।
তখন শুরু হয় যোগাযোগের এক অন্তহীন চক্র। এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তর, এক টেবিল থেকে অন্য টেবিল, এক কর্মকর্তার কাছ থেকে আরেক কর্মকর্তার কাছে ছুটতে ছুটতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কখনো তিনি নিজের কাজের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করেন কাজটি কোথায় আটকে আছে, সেটি খুঁজতে।
রাষ্ট্রীয় সেবার উদ্দেশ্য তো এমন হওয়ার কথা নয়।
প্রশ্ন হলো, এই সমস্যার সমাধান কী?
সমাধান শুরু হতে পারে একটি সহজ জায়গা থেকে—জবাবদিহি। প্রতিটি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে এবং সেই সময়সীমা নাগরিককে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। কাজ কেন বিলম্বিত হচ্ছে, তার কারণও জানার অধিকার নাগরিকের থাকতে হবে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর টেবিলে ফাইল অযথা পড়ে থাকলে তারও জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।
প্রয়োজন আরও বেশি নাগরিকবান্ধব সেবা ব্যবস্থা। ডিজিটাল ট্র্যাকিং, আবেদন গ্রহণের রসিদ, নির্ধারিত সময়সীমা, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের বাস্তব অনুসরণ—এসব কার্যকরভাবে চালু করা গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।
তবে সবকিছুর ওপরে প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের ওপর কোনো বিশেষ ক্ষমতার মালিক নন; তাঁরা রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী। তাঁদের সম্মান আছে, মর্যাদা আছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব আছে—কিন্তু সেই দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জনগণ।
একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারি অফিসে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর পোশাক, আর্থিক অবস্থা, পরিচিতি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে তাঁকে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। তিনি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক। তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা এবং তাঁর ন্যায্য সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ—কখনো কখনো নিজের পরিচয়, পদমর্যাদা ও প্রটোকলকে আড়ালে রেখে মাঠে নামুন। সাধারণ মানুষের পাশে বসুন। তাঁদের কথা শুনুন। তাঁদের মতো লাইনে দাঁড়ান। দেখুন, একটি ছোট সরকারি কাজের জন্য একজন মানুষকে কতবার অফিসে আসতে হয়।
তাহলেই হয়তো ফাইলের পাতায় নয়, মানুষের চোখে দেখা যাবে জনসেবার প্রকৃত চিত্র।
মনে রাখা দরকার—রাষ্ট্রের প্রকৃত মর্যাদা বড় ভবনে নয়, একজন সাধারণ নাগরিক কতটা সম্মান ও সহজে তার ন্যায্য সেবা পেলেন, তার মধ্যেই প্রকাশ পায়।
জনগণ প্রজা নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রাজা নন। সবাই একই রাষ্ট্রের নাগরিক—কেউ দায়িত্বে, কেউ সেবাপ্রার্থী।
আর সরকারি দপ্তরের দরজা যখন একজন সাধারণ মানুষের জন্য খুলবে, তখন সেখানে যেন ক্ষমতার অহংকার নয়, সেবার মানবিকতা দেখা যায়—এই প্রত্যাশাই আজকের নাগরিকের।
Leave a Reply