মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশের লাখো শিক্ষার্থীকে মানুষ গড়ার কাজে নিয়োজিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ এই শিক্ষকরাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর।
বিএনপি সরকার যদি তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। তাই সরকারের কাছে প্রশ্ন—সাহস করে কি একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া যায় না?
ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যা শুধু একটি সরকারের পরিচয় বহন করে না; বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অতীতে নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় মাধ্যমিকসহ অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া হলে সেটিও হতে পারে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
এটি কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ নয়। বরং এটি শিক্ষার মানোন্নয়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর করার একটি নীতিগত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
একজন শিক্ষক যখন মাস শেষে সংসারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খান, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাড়িভাড়া কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের পেশাগত মনোযোগ আশা করা কতটা বাস্তবসম্মত? পেটে ক্ষুধা থাকলে, মনে দুশ্চিন্তা থাকলে, সংসারে প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিক চাপ থাকলে মানুষের কাজে মন বসানো কঠিন—শিক্ষকরাও তার বাইরে নন।
তাই শিক্ষকের জীবনমান উন্নত করা মানে শুধু একজন শিক্ষককে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং একজন শিক্ষকের মাধ্যমে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা।
জাতীয়করণের উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর্থিক ও প্রশাসনিক নানা চ্যালেঞ্জ অবশ্যই রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান একই মানের নয়, সব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোও সমান নয়। তাই একসঙ্গে সব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা গ্রহণ করা যেতে পারে। দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনে সেসব প্রতিষ্ঠানের যোগ্য শিক্ষকদের ভালো বা মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
এতে একদিকে শিক্ষকদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঠিক ব্যবহার হবে, অন্যদিকে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরে ধীরে পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে। একটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সবচেয়ে বড় কথা, বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হলে তাঁরা আরও নিশ্চিন্ত মনে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করতে পারবেন। আর শিক্ষক যখন নিশ্চিন্ত, সম্মানিত ও নিরাপদ থাকেন, তখন তাঁর কাছ থেকে শিক্ষার্থীরাও আরও বেশি কিছু পাওয়ার সুযোগ পায়।
আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অসংখ্য মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও পেশাজীবীর শিক্ষাজীবনের শুরু হয়েছিল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে। সেই শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকই হয়তো নিজের জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা পাননি, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থী আজ রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
তাহলে সেই শিক্ষকের জীবনমান উন্নয়নে আমাদের এত দ্বিধা কেন?
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো যখন শিক্ষকদের সামনে প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ নয়—এটি মানুষের আস্থার মর্যাদা রক্ষা। বিএনপি যদি নির্বাচনের পূর্বে বেসরকারি শিক্ষকদের জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে, তাহলে ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া তাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।
বিশেষ করে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে শিক্ষকদের উদ্দেশে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথাও যদি থাকে, তবে বর্তমান নেতৃত্ব সেই অঙ্গীকারকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যেতে পারে। একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ কখনো শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়; এটি মানুষের হৃদয়ে আস্থা তৈরি করে।
তাই বিএনপি সরকারের প্রতি কোনো দলীয় আবেগ থেকে নয়, একজন সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা থেকেই আহ্বান—সাহস করুন। বাস্তবতা বিবেচনা করে, বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে, আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করুন।
হয়তো আজকের সেই সাহসী সিদ্ধান্তই আগামী দিনের বাংলাদেশে শিক্ষকদের মুখে স্বস্তির হাসি এনে দেবে। হয়তো কোনো শিক্ষক তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করবেন না। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী তার প্রিয় শিক্ষককে আরও আত্মবিশ্বাসী, আরও মর্যাদাবান অবস্থায় দেখতে পাবে।
সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক দল পরিবর্তন হয়, সময় পরিবর্তন হয়—কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে দেন শিক্ষক।
তাই শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করুন, শিক্ষকের জীবনমান উন্নত করুন, শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য কমান।
সাহস করে একটি ঘোষণা দিন—যে ঘোষণা শুধু আজকের সংবাদ হবে না; বরং আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের শিক্ষা-ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক ~ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Leave a Reply