মোহাম্মদ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, মামলা-মোকদ্দমা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেখানে যদি প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত বিরোধই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত কিছু অভিযোগ পরবর্তীতে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। আবার কিছু অভিযোগের তদন্তও হয়েছে। ফলে কে সঠিক, কে ভুল, তা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর মিথ্যা হলে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধ করে তাদের সম্মানও ফিরিয়ে দিতে হবে।

বিশেষ করে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলো হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব, রসিদ, ব্যাংক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কোনো ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোন না কেন, বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর বিভিন্ন শিক্ষার্থী সাথে কথা বললে তারা জানান ভর্তি ফরমসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করা হলে লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে। এতে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং বিদ্যালয়ের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ জানান, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অভিযোগ ও মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক অভিযোগ তদন্ত করে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে। তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে শিক্ষকদের মধ্যকার চলমান কোন্দল ও রেষারেষি সামাজিকভাবে বসে মীমাংসা করা জরুরি।
তিনি বলেন, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রভাব যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক বিরোধ কিংবা ক্ষমতার টানাপোড়েনের দায় কেন শিক্ষার্থীদের বহন করতে হবে? একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশ যদি বিরোধের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তাহলে এর দায় শুধু ব্যক্তির নয়, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষেরও। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযুক্ত করাও সমানভাবে অনৈতিক।
এ অবস্থায় অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের রাজনীতি বন্ধ করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব-নিকাশ যাচাই, প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরোধ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, বিদ্যালয় কারও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, স্বার্থ কিংবা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হতে পারে না। বিদ্যালয়ের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার হতে হবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কঠোর, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা, মিথ্যা হলে অব্যাহতি এবং সর্বোপরি বিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply