লেখক ~ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
“খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে,
প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে।”
কত গভীর এক জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে এই পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে! মানুষ যে পৃথিবীকে এত আপন করে দেখে, যে জীবনকে ঘিরে এত আয়োজন, যে সম্পদ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও অহংকারকে নিজের অস্তিত্বের অংশ মনে করে—সৃষ্টির অসীমতার সামনে তার সবকিছুই যেন ক্ষণিকের খেলা। মহাবিশ্বের বিশাল পরিসরে মানুষ অতি ক্ষুদ্র; অথচ এই ক্ষুদ্র মানুষই কখনো কখনো নিজেকে পৃথিবীর কেন্দ্র বলে ভাবতে শুরু করে।
এই উপলব্ধিকে হৃদয়ে ধারণ করলে মানুষের অহংকার অনেকটাই নরম হয়ে আসে। আমরা বুঝতে পারি, পৃথিবীতে আমাদের আগমন সাময়িক। জন্মের আগে পৃথিবী ছিল, আমাদের চলে যাওয়ার পরও থাকবে। আমরা আসি, কিছুদিন স্বপ্ন দেখি, ভালোবাসি, সংগ্রাম করি, কিছু স্মৃতি রেখে চলে যাই। অথচ এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা কত কিছু নিজের বলে দাবি করি!
“শূন্যে মহা আকাশে
মগ্ন লীলা বিলাসে,
ভাঙিছ গড়িছ নিতি ক্ষণে ক্ষণে।”
সৃষ্টি ও ধ্বংস—এই দুইয়ের অবিরাম প্রবাহেই পৃথিবীর জীবন। কোথাও জন্ম, কোথাও মৃত্যু; কোথাও নির্মাণ, কোথাও পতন। প্রকৃতি কখনো স্থির নয়। নদী ভাঙে, আবার চর জাগে। পুরোনো পাতা ঝরে পড়ে, নতুন পাতা জন্ম নেয়। একটি প্রজন্ম বিদায় নেয়, আরেকটি প্রজন্ম পৃথিবীর দায়িত্ব গ্রহণ করে। সভ্যতা গড়ে ওঠে, সময়ের আঘাতে আবার তার রূপ বদলে যায়।

এই পরিবর্তনই জীবনের শাশ্বত সত্য।
কিন্তু মানুষ পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারে না। সে চায় যৌবন চিরকাল থাকুক, সম্পদ অক্ষয় হোক, ক্ষমতা অটুট থাকুক, প্রিয়জন সবসময় পাশে থাকুক। অথচ সময় কারও ইচ্ছার কাছে থেমে থাকে না। যে শিশু আজ মায়ের কোলে, একদিন সে তরুণ হবে; তারুণ্য পেরিয়ে বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছাবে। জীবনের এই অমোঘ যাত্রাকে কেউ থামাতে পারে না।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সৃষ্টিতে মানুষের এই ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের মধ্যেও এক অসীম শক্তির সন্ধান করেছেন। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ছিল না; তাঁর বিদ্রোহ ছিল মানুষের ভেতরের ভীরুতা, অন্যায়, অসাম্য ও আত্মবন্দিত্বের বিরুদ্ধেও। তিনি মানুষকে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে মানুষ ক্ষুদ্র নয়—মানুষের আত্মমর্যাদা অসীম।
নজরুলের সেই চেতনা আমাদের এই উপলব্ধিও দেয় যে, মানুষ ক্ষণস্থায়ী হলেও তার কর্ম ক্ষণস্থায়ী হতে বাধ্য নয়। একটি জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু একটি মহৎ কাজ বহু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। একজন মানুষের উচ্চারণ যুগের পর যুগ মানুষের বিবেককে জাগিয়ে রাখতে পারে। একজন মানুষের সাহস অন্য হাজার মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দিতে পারে।
এই কারণেই জীবনের দৈর্ঘ্যের চেয়ে জীবনের গভীরতা গুরুত্বপূর্ণ।
“তারকা রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী,
পড়িয়া আছে রাঙা পায়ের কাছে রাশি রাশি।”
মহাবিশ্বের অসীমতার সামনে এই পঙ্ক্তি মানুষের অহংকারকে যেন এক মুহূর্তে থামিয়ে দেয়। যে সূর্য আমাদের কাছে অপরিসীম শক্তির প্রতীক, যে চাঁদ রাতের আকাশে সৌন্দর্য ছড়ায়, যে অসংখ্য তারকা দেখে আমরা বিস্ময়ে অভিভূত হই—সৃষ্টির মহাব্যবস্থায় তারাও বৃহত্তর এক রহস্যের অংশ। সেখানে মানুষের অবস্থান কতটুকু!
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার সীমাবদ্ধতা নয়; তার অহংকার। সামান্য ক্ষমতা পেয়েই কেউ নিজেকে অপরাজেয় ভাবে। সামান্য অর্থ হাতে এলেই কেউ মনে করে পৃথিবী তার নিয়ন্ত্রণে। কিছুটা জনপ্রিয়তা পেলেই কেউ ভুলে যায়—মানুষের স্মৃতি বড়ই ক্ষণস্থায়ী।
ইতিহাস আমাদের বারবার এই শিক্ষা দিয়েছে। কত রাজা, সম্রাট, শাসক, ক্ষমতাবান মানুষ পৃথিবীতে এসেছেন। তাঁদের প্রাসাদ ছিল, সৈন্য ছিল, ক্ষমতা ছিল, আদেশ ছিল। কিন্তু সময়ের স্রোত তাঁদের সবাইকে একদিন সরিয়ে দিয়েছে। আজ তাঁদের অনেকের নাম কেবল ইতিহাসের পাতায়। ক্ষমতার সিংহাসন রয়ে গেছে, কিন্তু সিংহাসনে বসা মানুষটি নেই।
তাহলে মানুষের অর্জনের মূল্য কোথায়?
মূল্য আছে—তবে সেই মূল্য সম্পদের পরিমাণে নয়, মানবিকতার গভীরতায়। একজন মানুষ কত টাকা রেখে গেলেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কতটা ভালোবাসা রেখে গেলেন। কত মানুষের দুঃখ বুঝলেন, কত অসহায়ের পাশে দাঁড়ালেন, কত অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেন, কত অন্ধকার জীবনে আশার আলো জ্বাললেন—মানুষের প্রকৃত মূল্য সেখানেই।
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা আমাদের সেই মানবিক সাহসের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যায় দেখে নীরব থাকা সহজ; প্রতিবাদ করা কঠিন। দুর্বলকে দমন করা সহজ; তার পাশে দাঁড়ানো কঠিন। নিজের স্বার্থকে বড় করা সহজ; মানুষের স্বার্থকে নিজের স্বার্থের ওপরে স্থান দেওয়া কঠিন। অথচ সত্যিকারের মানুষ হওয়ার পথটি সহজ নয়।
জীবন অনিত্য বলেই প্রতিটি ভালো কাজের গুরুত্ব আরও বেশি। আমরা জানি না আগামীকাল কী অপেক্ষা করছে। যে কথাটি আজ প্রিয়জনকে বলা দরকার, তা কাল বলা নাও হতে পারে। যে মানুষটির পাশে আজ দাঁড়ানো প্রয়োজন, কাল হয়তো সে আমাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে। যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজ কথা বলা সম্ভব, কাল হয়তো তার ক্ষতি আরও গভীর হয়ে উঠবে।
তাই যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন অর্থপূর্ণভাবে বাঁচাই শ্রেয়।
“নিত্য তুমি, হে উদার
সুখে দুখে অবিকার;
হাসিছ খেলিছ তুমি আপন মনে।”
এই উপলব্ধির মধ্যে মানুষের জন্য এক গভীর শান্তির শিক্ষা রয়েছে। সুখ যেমন চিরস্থায়ী নয়, দুঃখও তেমন নয়। জীবনে যেমন বসন্ত আসে, তেমনি আসে শীত। যেমন আলো আসে, তেমনি অন্ধকার নামে। যে মানুষ সুখের দিনে অহংকারে অন্ধ হয় না এবং দুঃখের দিনে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না, সে-ই জীবনের প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে।
আমরা অনেক সময় সাফল্যকে সম্পূর্ণ নিজের কৃতিত্ব মনে করি, আবার ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপাই। অথচ জীবনের সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। মানুষ চেষ্টা করতে পারে, পরিশ্রম করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে; কিন্তু ফলাফল সবসময় তার হাতে থাকে না। এই সত্য মেনে নেওয়ার মধ্যেই বিনয় জন্ম নেয়।
সৃষ্টির এই বিশাল খেলাঘরে তাই মানুষের দায়িত্ব নিজেকে বড় প্রমাণ করা নয়; নিজেকে যোগ্য করে তোলা। ক্ষমতা পেয়েও বিনয়ী থাকা, সম্পদ পেয়েও উদার থাকা, জ্ঞান অর্জন করেও সহনশীল থাকা এবং শক্তিশালী হয়েও দুর্বলের প্রতি মানবিক থাকা—এসবই মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য।
একদিন আমাদের সবাইকে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে। সেদিন সঙ্গে যাবে না কোনো পদবি, সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা বাহ্যিক পরিচয়। সঙ্গে যাবে আমাদের কর্মের হিসাব। মানুষের হৃদয়ে আমরা যে স্মৃতি রেখে যাব, সেটিই হবে আমাদের প্রকৃত উত্তরাধিকার।
আমরা চলে যাব, কিন্তু পৃথিবী থেমে থাকবে না। সূর্য উঠবে, নদী বয়ে যাবে, পাখি গান গাইবে, শিশুরা খেলবে, নতুন মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখবে। সৃষ্টি তার আপন নিয়মে চলবে। এই বিশাল মহাজগতের খেলায় আমাদের উপস্থিতি ক্ষণিকের।
তবু এই ক্ষণিক জীবন অর্থহীন নয়।
কারণ মানুষ কত বছর বেঁচেছিল, তার চেয়ে বড় কথা—সে কেমনভাবে বেঁচেছিল। কত সম্পদ অর্জন করেছিল, তার চেয়ে বড় কথা—কত হৃদয় জয় করেছিল। কত ক্ষমতা পেয়েছিল, তার চেয়ে বড় কথা—ক্ষমতা দিয়ে কতটা কল্যাণ করেছিল।
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ আমাদের শেখায় মাথা নত না করতে; আর এই গানের দর্শন শেখায় অহংকার না করতে। এই দুই উপলব্ধির সমন্বয়েই মানুষের পূর্ণতা—অন্যায়ের সামনে দৃঢ়, কিন্তু সৃষ্টির মহিমার সামনে বিনয়ী।
তাই এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক—অন্যায় করব না, অন্যায় সহ্য করব না; মানুষকে ছোট করব না, মানুষকে ভালোবাসব; ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হব না, মানবিকতার আলোয় নিজেকে আলোকিত করব।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই এই পৃথিবীর ক্ষণিকের অতিথি।
জীবন চলে যাবে, সময় ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ, সাহসী উচ্চারণ ও মানবিক স্পর্শ—সৃষ্টির মহালীলার মধ্যে দীর্ঘদিন প্রতিধ্বনিত হতে পারে।
Leave a Reply