মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
একদিকে পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার তাগিদগ, অন্যদিকে লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন যাঁরা অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে রাস্তায় নামেন, তাঁদেরই এখন কাটছে দুশ্চিন্তায়। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় পৌরসভার অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশা চালিয়ে আসা প্রায় ৬০০ চালক লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় সংকটে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, গত বছর থেকে নবায়ন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
অটোরিকশার চাকা থেমে গেলে শুধু একজন চালকের উপার্জন বন্ধ হয় না, থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় একটি পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা। চালকদের দাবি অনুযায়ী, তাঁদের পরিবারের সদস্যসহ প্রায় ৫ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। ফলে লাইসেন্স নবায়নের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মধ্যে।
সংসার চালাবেন, নাকি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরবেন?
অটোচালকদের জীবনের বাস্তবতা খুবই কঠিন। প্রতিদিন গাড়ি চালিয়ে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, সন্তানের লেখাপড়া, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। অনেক চালকের কাছে অটোরিকশাই পরিবারের একমাত্র বা প্রধান আয়ের উৎস।

কিন্তু লাইসেন্স নবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় তাঁরা এখন নতুন সংকটের মুখোমুখি। একদিকে নিয়ম মেনে গাড়ি চালানোর প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে সংসারের খরচ জোগানোর বাধ্যবাধকতা। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
তাঁদের প্রশ্ন, জীবিকার তাগিদে গাড়ি চালাবেন, নাকি লাইসেন্স নবায়নের আশায় দিনের পর দিন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরবেন?
গত বছর থেকে নবায়ন বন্ধের অভিযোগ,
একজন চালকের আয় বন্ধ হওয়ার অর্থ একটি পরিবারের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে চাপ সৃষ্টি হওয়া। তাই লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতাকে তাঁরা কেবল প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখছেন না, বরং জীবিকা ও মানবিক সংকট হিসেবেও বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন।
প্রশাসনের কাছে চালকদের প্রত্যাশা কী?
চালকদের দাবি, যাঁরা আগে থেকেই পৌরসভার অনুমোদন নিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে আসছেন, তাঁদের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি যাচাই করে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো হোক। একই সঙ্গে নবায়ন কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণ স্পষ্ট করা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও আইনগত বিধান নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং প্রযোজ্য বিধিবিধানের আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি পর্যালোচনা করে আইনসম্মত ও বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ নির্ধারণ করা।
কিশোরগঞ্জের অটোরিকশাচালকদের এই সংকটের সমাধান কত দিনে হবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। লাইসেন্স নবায়নসংক্রান্ত জটিলতার কারণ স্পষ্ট করা, আবেদন যাচাই এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে দ্রুত পদক্ষেপ চান তাঁরা।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে চালকদের অনিশ্চয়তা দূর করতে উদ্যোগ নেবে। এতে যেমন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, তেমনি হাজারো মানুষের জীবিকা নিয়েও তৈরি হওয়া উদ্বেগ কমবে।
যে হাত অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে পরিবারের অন্ন জোগায়, সেই হাত আজ অনিশ্চয়তার চাপে অসহায়। ৬০০ চালকের এই সংকট নিরসনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী চালক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।
Leave a Reply