মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
মানুষ অসুস্থ হলে প্রথম যে দরজায় কড়া নাড়ে, সেটি চিকিৎসকের দরজা। কারণ চিকিৎসক কেবল পেশাজীবী নন, তিনি মানুষের জীবনরক্ষার এক আস্থার প্রতীক। কিন্তু যখন সেই আস্থার জায়গায় প্রশ্ন ওঠে, যখন চিকিৎসা সেবার ভেতরে প্রতারণা, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক মনোভাব কিংবা নৈতিক বিচ্যুতির অভিযোগ সামনে আসে, তখন তা শুধু একজন রোগীর কষ্ট নয়—সমগ্র সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একদিকে সমাজে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা প্রকৃত ডিগ্রি বা বৈধ যোগ্যতা ছাড়াই “ডাক্তার” পরিচয়ে চিকিৎসা দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করছেন। গ্রাম-গঞ্জে, মফস্বলে কিংবা শহরের অলিগলিতে এমন ভুয়া চিকিৎসকদের উপস্থিতি নতুন নয়। তারা কখনও চটকদার সাইনবোর্ড, কখনও ভুয়া সার্টিফিকেট, কখনও মুখের মিষ্টি কথায় মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অসহায় রোগী, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ, অজ্ঞতা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের ফাঁদে পড়ে। ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা কিংবা বিলম্বিত চিকিৎসার কারণে অনেকের জীবন পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এটি নিঃসন্দেহে ভয়ংকর প্রতারণা। কারণ একজন ভুয়া চিকিৎসক কেবল অর্থ হাতিয়ে নেয় না, সে মানুষের জীবন নিয়েও খেলা করে। এমন প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর সামাজিক ও আইনি অবস্থান প্রয়োজন। চিকিৎসা সেবা কোনো পরীক্ষাগার নয়, এখানে মানুষের জীবনই মূল বিবেচ্য।
কিন্তু অন্যদিকে আরেকটি বাস্তবতা নিয়েও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, কিছু যোগ্য চিকিৎসক প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা লিখে দেন। একটি সাধারণ সমস্যার ক্ষেত্রেও কখনও পাঁচ, সাত, এমনকি দশটি পরীক্ষার তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। রোগী চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাস রেখে সেই পরীক্ষা করান। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—সবগুলো পরীক্ষা কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো আর্থিক সম্পর্ক কাজ করছে?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় দেখা যায় নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। পরে রোগীকে “বিশেষ ছাড়” বা “৪০ শতাংশ ডিসকাউন্ট” দিয়ে বিল ধরানো হয়। এই ছাড়ের অভিনয় অনেকের কাছে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশল বলেই মনে হয়। কারণ প্রথমে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি বিল তৈরি করে পরে ছাড় দেখানো হলে রোগী মনে করে সে উপকার পেয়েছে। অথচ শেষ পর্যন্ত হয়তো সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ই বহন করছে।
এখানে সব চিকিৎসককে এক কাতারে ফেলা অন্যায় হবে। অসংখ্য সৎ, মানবিক ও নীতিবান চিকিৎসক আছেন, যারা রাত-দিন মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজ করছেন। তাঁদের প্রতি সমাজ কৃতজ্ঞ। কিন্তু কিছু অনিয়ম যদি আস্থার ভিত নড়বড়ে করে, তবে সেই প্রশ্ন উচ্চারণও জরুরি।
চিকিৎসা পেশা শুধু পেশা নয়, এটি মানবসেবার এক পবিত্র অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারে যখন বাণিজ্যের ছায়া গাঢ় হয়, তখন রোগী কেবল আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসকের কাছে যায় আশ্বাসের জন্য, হিসাবের খাতায় বন্দি হতে নয়।
আজ প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে যেমন অভিযান জরুরি, তেমনি পরীক্ষানির্ভর অতিরিক্ত বাণিজ্যিক প্রবণতার বিরুদ্ধেও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কমিশন সংস্কৃতি, অপ্রয়োজনীয় টেস্ট—এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া দরকার। চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে মানুষের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি বা প্রতারণার জায়গা থাকা উচিত নয়। একইসঙ্গে রোগীদেরও সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নিতে হবে, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে হবে, এবং চিকিৎসাকে অন্ধভাবে নয়—সচেতনভাবে গ্রহণ করতে হবে।
চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক বিশ্বাসের। সেই বিশ্বাস টিকে থাকুক মানবতা, সততা ও নৈতিকতার ওপর। কারণ চিকিৎসা যদি বাণিজ্যে পরিণত হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষ; আর মানুষ হারালে সমাজ হারায় তার বিবেক।
আমরা এমন এক চিকিৎসাব্যবস্থা চাই, যেখানে ভুয়া ডাক্তারদের স্থান নেই, আবার যোগ্য চিকিৎসকরাও বাণিজ্যের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হবেন না। যেখানে রোগী হবে সেবার কেন্দ্রবিন্দু, মুনাফার উপকরণ নয়। কারণ মানুষের জীবন কোনো ডিসকাউন্টের খাতায় মাপা যায় না—এটি সম্মান, আস্থা ও দায়িত্বের বিষয়।
লেখক ~কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর
Leave a Reply