নিজস্ব প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমান :গোপালগঞ্জ
উচ্চ বেতনে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে গোপালগঞ্জের তিন যুবককে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার এক ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠেছে ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ওই যুবকদের জোরপূর্বক সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখভাগে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাদের দেওয়া হচ্ছে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে চলছে চরম আহাজারি ও আতঙ্ক। প্রিয় সন্তানদের অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ভাগ্য ফেরানোর আশায় গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দি
ভুক্তভোগী তিন যুবক হলেন—
০১)সৌরভ মোল্লা: বলাকইড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে।
০২)রনি ফকির: গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সিতারকুল গ্রামের বাসিন্দা।
০৩)পলাশ শেখ: ঘোষেরচর গ্রামের জামিল শেখের ছেলে।
স্বজনরা জানান, একটু সুখের আশায়, জমি-জমা ও সহায়-সম্বল বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ধারদেনা করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন রূপ নিয়েছে যমদূতে।
যেভাবে চলল প্রতারণার ফাঁদ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ এলাকার সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি ‘জাবাল ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ (লাইসেন্স নং: আরএল-২৫০৫)-এর মাধ্যমে গত ৭ মে ওই তিন যুবক রাশিয়ায় পৌঁছান।
এজেন্সির পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তাদের ভালো কোম্পানিতে নিরাপদ কাজ দেওয়া হবে।
তবে রাশিয়ায় পা রাখতেই পাল্টে যায় পুরো দৃশ্যপট। পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ার পৌঁছানোর পরপরই এজেন্সির স্থানীয় প্রতিনিধিরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই তিন যুবককে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।
”আমাদের বলা হয়েছিল ভালো কোম্পানিতে কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু ওখানে যাওয়ার পর তাদের একটি ক্যাম্পে আটকে রেখে জোরপূর্বক সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এখন তাদের ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো সময় তাদের মরণকূপে ঠেলে দেওয়া হতে পারে!”
— কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন এক ভুক্তভোগীর স্বজন।
এজেন্সির কার্যালয় ফাঁকা, পাওয়া যায়নি কাউকে
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে রাজধানীর খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ (বাসা-২৯, রোড-০৯) এলাকায় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘জাবাল ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’-এর কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে রাশিয়ায় এই তিন যুবককে বিক্রির খবর জানাজানি হওয়ার পর থেকেই এজেন্সির দায়িত্বশীল কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া গেছে।
প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি
সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচারকারী আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে সাধারণ বাংলাদেশিদের এভাবে প্রতারণা করে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সচেতন মহল মনে করছেন, এটি কেবল প্রতারণা নয়, বরং স্পষ্ট মানবপাচার এবং জীবনের চরম ঝুঁকি।
গোপালগঞ্জের এই তিন অসহায় যুবককে দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং এই কুচক্রী মানবপাচারকারী রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।

Leave a Reply