মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
জন্মের পর থেকেই জীবন ছিল সংগ্রামের। ছিল না আর্থিক স্বচ্ছলতা, ছিল না কোনো বিলাসিতা কিংবা সহজ পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। একের পর এক প্রতিকূলতা, দারিদ্র্য আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই বড় হয়েছেন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার রশিদাবাদ ইউনিয়নের সীমান্তপুর গ্রামের যুবক আনিস। কিন্তু জীবনযুদ্ধের কাছে কখনো হার মানেননি তিনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। অথচ উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও একটি সরকারি চাকরি আজও অধরাই রয়ে গেছে।
আজ আনিসের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করে নিজের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরা এবং তার প্রয়াত মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য একটি সরকারি চাকরির সুযোগ প্রার্থনা করা।

আনিসের বাবা ছিদ্দিক একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতা। সামান্য আয়ে আট সদস্যের সংসার চালানোই তার জন্য ছিল কঠিন সংগ্রাম। সেই পরিবারেই জন্ম নেওয়া দুই সন্তান, আনিস ও তার বোন আমেনা, দুজনেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাদের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দিতে পারেনি। আনিস অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন, আর তার বোন আমেনা বিএ পাস করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই আনিস ও আমেনা শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। অনেকেই যেখানে প্রতিবন্ধকতাকে জীবনের শেষ বলে মনে করেন, সেখানে আনিস নিজের অধ্যবসায়, সাহস ও শিক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারে না।
আনিসের মা ফুলেছা আক্তারের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল, তার দুই প্রতিবন্ধী সন্তান লেখাপড়া শিখে সরকারি চাকরি করবে এবং সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও সন্তানদের চাকরির মুখ না দেখতে পেরে মানসিক কষ্টে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন এবং ২০২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
মায়ের সেই অপূর্ণ স্বপ্নই আজ আনিসের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা।

আনিস জানান, সরকারি চাকরির আশায় তিনি এখন পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৪০০টি লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভায় অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসতে হয়েছে হতাশা নিয়ে। সরকারি চাকরির বয়সসীমাও আর মাত্র ছয় থেকে সাত মাস বাকি। সময় যত ফুরিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তার অনিশ্চয়তা।
কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে ওঠে আনিসের। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“আমি কখনো কারও করুণা চাইনি। আমি শুধু আমার যোগ্যতার মূল্যায়ন চাই। আমি পড়াশোনা করেছি, কঠোর পরিশ্রম করেছি। প্রতিবন্ধী হিসেবে রাষ্ট্রের যে সুযোগ পাওয়ার কথা, সেটুকুই চাই। আমার মায়ের শেষ স্বপ্ন ছিল আমাকে সরকারি চাকরিতে দেখতে। আমি শুধু সেই স্বপ্নটা পূরণ করতে চাই। যদি একবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতাম, তাহলে আমার জীবনের সংগ্রামের গল্পটি তাঁর সামনে তুলে ধরতাম।”
চাকরির আশায় আনিস দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবেদন করছেন, পরীক্ষা দিচ্ছেন, সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরি এখনো অধরা। তবুও তিনি আশা ছাড়েননি। বিশ্বাস করেন, একদিন হয়তো তার যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে।
আনিসের গল্প শুধু একজন প্রতিবন্ধী যুবকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের হাজারো প্রতিবন্ধী শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যারা মেধা, যোগ্যতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে যেতে চান, কিন্তু সুযোগের অভাবে বারবার পিছিয়ে পড়েন।
সমাজের সচেতন মহলের মতে, শিক্ষিত ও যোগ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবিকা নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রতীক।
আনিস এখনো বিশ্বাস করেন, মানুষের ভালোবাসা, সমাজের সহমর্মিতা এবং রাষ্ট্রের আন্তরিক উদ্যোগ একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তার একটাই আবেদন, “আমাকে করুণা নয়, আমার প্রাপ্য সুযোগটি দিন। আমি কাজ করে বাঁচতে চাই। আমি আমার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।”
হয়তো এই আবেদন শুধু আনিসের নয়, দেশের হাজারো সংগ্রামী প্রতিবন্ধী মানুষের নীরব আর্তনাদ। তাদের স্বপ্নও একদিন বাস্তব হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
Leave a Reply