মোঃ জোনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়নকাজে প্রায় ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ এবং এ নিয়ে অডিট আপত্তির খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত প্রতিবেদনে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামকে কাজ কম করে বিল উত্তোলন, নকশাবহির্ভূত নির্মাণ, ভুয়া প্রাক্কলনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়।
তবে ওই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের দাপ্তরিক ভিত্তি যাচাই করতে গিয়ে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি, প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট আপত্তির কথা উল্লেখ করা হলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরের কথিত অনিয়মের সঙ্গে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামের দায়িত্বকালগত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে দায়িত্বেই ছিলেন না রফিকুল ইসলাম
পৌরসভার দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, মো. রফিকুল ইসলাম ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কিশোরগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের যেসব কাজ, বিল, পরিমাপ বা অডিট পর্যবেক্ষণের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে তাঁর সরাসরি দায়িত্বগত সম্পৃক্ততা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর যোগদানের তথ্য সাম্প্রতিক প্রকাশিত সংবাদেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ২০২২-২৩ অর্থবছরের কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হয়ে থাকলে সে সময় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কার প্রকৌশলী, পরিমাপকারী কর্মকর্তা, বিল প্রস্তুতকারী এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তির মূল নথি কোথায়?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট পৌর কর্মকর্তাদের দাবি, সেখানে অডিট আপত্তির নির্দিষ্ট স্মারক নম্বর, প্রকল্পের নাম, ওয়ার্ড নম্বর, কাজের স্থান, বিল নম্বর কিংবা অডিট পর্যবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।
পৌরসভার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম (মস্তান) বলেন, স্থানীয় সরকার অডিট অধিদপ্তর থেকে যেসব অডিট আপত্তি আসে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আপত্তির জবাবও দেওয়া হয়। তবে প্রকৌশল বিভাগের বিরুদ্ধে ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের যে নির্দিষ্ট অডিট আপত্তির কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটির চিঠি তাঁদের দপ্তরে পাওয়া বা নিবন্ধিত হওয়ার তথ্য তাঁর জানা নেই।
ফলে এখন বড় প্রশ্ন হলো, ৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তির স্মারক নম্বর, মূল আপত্তিপত্র, প্রকল্পভিত্তিক হিসাব এবং অডিট কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ কোথায়?

৬৫ মিটার ড্রেনের কাজ নিয়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকার অভিযোগ
প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি ৬৫ মিটার ড্রেন নির্মাণের পরিবর্তে ৫৫ মিটার নির্মাণ করে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগ করা হয়েছে।
কিন্তু পৌর প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতিবেদনে ওই ড্রেনের ওয়ার্ড নম্বর, প্রকল্পের নাম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম, কাজের অনুমোদনের তারিখ, প্রাক্কলিত ব্যয়, বিলের পরিমাণ কিংবা মেজারমেন্ট বুকের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, উল্লিখিত অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দিষ্ট প্রকল্পের তথ্য তাঁদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। তাঁর মতে, কোনো প্রকল্পে কাজের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়ে থাকলে তার কারণ ও অনুমোদন সংশ্লিষ্ট নথি দেখে যাচাই করা প্রয়োজন।

স্লাব ও সলিংয়ের অভিযোগেও প্রকল্পের পরিচয় স্পষ্ট নয়
প্রতিবেদনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রায় ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার স্লাব নির্মাণ এবং পুরোনো সড়কের নিচে সলিং দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হক জুয়েল বলেন, অভিযোগগুলো যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, ওয়ার্ড, কাজের স্থান ও বিলের তথ্য প্রয়োজন।
তিনি জানান, চূড়ান্ত বিল পরিশোধের আগে কাজ সরেজমিনে পরিমাপ করা হয়। পরিমাপের তথ্য মেজারমেন্ট বুক বা এমবিতে লিপিবদ্ধ করার পর বিল প্রস্তুত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে যাচাই শেষে বিল অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়।
উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদও বলেন, প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত অডিট আপত্তির নির্দিষ্ট চিঠি পৌরসভায় পাওয়া বা নিবন্ধিত হওয়ার তথ্য তাঁর জানা নেই।
৩১ লাখ টাকার জরুরি মেরামত নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিবেদনে জরুরি মেরামতকাজে প্রায় ৩১ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগও করা হয়েছে।
সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান বলেন, পৌরসভার দৈনন্দিন নাগরিক সেবা সচল রাখতে বিভিন্ন সময় জরুরি মেরামতের প্রয়োজন হয়। প্রশাসক বা মেয়রের অনুমোদন এবং প্রচলিত বিধি অনুসরণ করে এসব কাজ করা হয়ে থাকে।
তাঁর দাবি, জরুরি মেরামতের কাজকে নিয়মিত টেন্ডারভুক্ত উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে একইভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। প্রতিটি কাজের বাস্তব পরিমাণ সরেজমিনে যাচাই করে মেজারমেন্ট বুক ও বিল ফরমে লিপিবদ্ধ করা হয়।
‘অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি প্রমাণিত নয়’
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার কোনো উন্নয়নকাজের বিল এককভাবে তাঁর হাতে চূড়ান্ত হয় না। মাঠপর্যায়ে কাজ পরিমাপ, মেজারমেন্ট বুকে তথ্য লিপিবদ্ধ, সহকারী প্রকৌশলীর যাচাই, বিল প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন, “অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাৎ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। অডিট আপত্তি একটি প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জবাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে হয়। জবাব সন্তোষজনক হলে আপত্তি নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার হতে পারে।”
একজন কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা নিয়ে প্রশ্ন
রফিকুল ইসলামের দাবি, একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। কাজের পরিমাপ থেকে শুরু করে এমবিতে তথ্য লিপিবদ্ধ, যাচাই-বাছাই, বিল প্রস্তুত, সুপারিশ ও অনুমোদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব থাকে।
তাই কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে শুধু একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পুরো নথি, দায়িত্বকাল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রকাশিত প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট প্রকল্প ও নথি উপস্থাপন না করায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
পাল্টা অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন
নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পৌরসভার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে সংবাদমাধ্যমকে ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
তবে এই দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন। একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণেও প্রয়োজন মূল অডিট নথি, প্রকল্পের অনুমোদন, প্রাক্কলন, কার্যাদেশ, মেজারমেন্ট বুক, বিল, ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকাল যাচাই।
এখন যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
৬১ লাখ টাকার কথিত অনিয়ম নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—
১. কথিত ৬১ লাখ টাকার অডিট আপত্তির স্মারক নম্বর কত?
২. অডিট আপত্তিটি কোন অর্থবছর ও কোন কোন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে?
৩. সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নাম, ওয়ার্ড ও কাজের স্থান কোথায়?
৪. ৬৫ মিটার ড্রেনের অভিযোগের প্রকল্প ও বিলের নথি কী বলে?
৫. ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকার স্লাব ও সলিংয়ের অভিযোগের ভিত্তি কী?
৬. প্রায় ৩১ লাখ টাকার জরুরি মেরামতের কাজগুলোর ভাউচার ও অনুমোদন কোথায়?
৭. ২০২২-২৩ অর্থবছরের কোনো অনিয়মের সঙ্গে ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যোগদানকারী নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের দায়িত্বগত সংশ্লিষ্টতা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
৮. অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে কি না এবং হয়ে থাকলে তা নিষ্পত্তি হয়েছে কি না?
নথিই দিতে পারে চূড়ান্ত উত্তর
কোনো অডিট আপত্তি উত্থাপিত হওয়া নিজেই চূড়ান্তভাবে দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ নয়। আবার শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতেও অভিযোগ খারিজ করা যায় না। প্রকৃত সত্য নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন অডিট অধিদপ্তরের মূল নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সরকারি রেকর্ড যাচাই।
সুতরাং কিশোরগঞ্জ পৌরসভার কথিত ৬১ লাখ টাকার অনিয়মের ঘটনায় অডিট আপত্তির মূল কপি, স্মারক নম্বর, প্রকল্পভিত্তিক হিসাব, মেজারমেন্ট বুক, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকাল প্রকাশ্যে যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অডিট কর্তৃপক্ষ, পৌর প্রশাসন এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে দায়ী করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কোনো অভিযোগকে অমূলক বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। প্রয়োজন নথিনির্ভর, প্রকল্পভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
Leave a Reply