মঠবাড়িয়ার দলিত সম্প্রদায়ের আবাসন ও অধিকার সংকটের অন্তরালের বাস্তবতা
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
মঠবাড়িয়া প্রতিনিধি।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী–মঠবাড়িয়া সড়কের পাশে একসময় ছিল “মুচিবাড়ী” নামে পরিচিত একটি স্থায়ী বসতি। প্রায় ২৫টি দলিত বা মুচি (হরিজন) পরিবারের কয়েক প্রজন্মের বসবাস ছিল এখানে। স্থানীয়দের ভাষায়, এলাকাটি ছিল দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম পরিচিত জুতা মেরামতকারীদের কেন্দ্র।
কিন্তু বর্তমানে সেই বসতির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং নিরাপদ আবাসনের অভাবে একে একে পরিবারগুলো নিজেদের ভিটেমাটি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এখন তারা ছড়িয়ে পড়েছে সরকারি বেরিবাঁধ, রাস্তার পাশ ও অনিরাপদ জায়গায়—যেখানে নেই স্থায়ী নিরাপত্তা কিংবা মৌলিক নাগরিক সুবিধা।
কেন হারিয়ে গেল ‘মুচিবাড়ী’?

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও মুচিবাড়ী ছিল স্বনির্ভর একটি শ্রমজীবী পাড়া। জুতা মেরামতই ছিল প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু আধুনিক প্রস্তুত জুতা ও সিন্থেটিক পণ্যের বাজার বিস্তারের ফলে ঐতিহ্যবাহী পেশার চাহিদা দ্রুত কমে যায়।
আয় কমে যাওয়ায় পরিবারগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জমি বিক্রি ছাড়া বিকল্প পথ না থাকায় ধীরে ধীরে বসতিটি ভেঙে যায়।
স্থানীয় হরিজন বাসিন্দা কমল দাস বলেন,
“আগে এই পেশায় সংসার চলত। এখন সারাদিন বসে থাকলেও কাজ পাওয়া যায় না। শিক্ষিত হলেও চাকরি পাই না—কারণ আমরা মুচি।”
সামাজিক বৈষম্য: অদৃশ্য কিন্তু বাস্তব দেয়াল
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য এই সম্প্রদায়ের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। অনেকেই জানান, এখনও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও জনপরিসরে তারা অবহেলা কিংবা অপমানজনক আচরণের শিকার হন।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দলিত মানুষ খাদ্যসেবার স্থানগুলোতে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ফলে সামাজিক মূলধারায় অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিচয়ের কারণে অনেক ক্ষেত্রে চাকরি বা কাজ পাওয়ার সুযোগও কমে যায়।
আবাসন সংকট: রাষ্ট্রীয় সহায়তা কোথায়?
বর্তমানে প্রায় ১০০ জনসংখ্যার এই সম্প্রদায়ের অধিকাংশ পরিবার ভূমিহীন। অনেকেই অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছেন, যেখানে নেই নিরাপদ পানির ব্যবস্থা বা স্যানিটেশন সুবিধা।
বর্ষা মৌসুম কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় তাদের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য বহুবার চেষ্টা করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
হরিজন সম্প্রদায়ের শতীস দাস বলেন,
“দিন খুব কষ্টে কাটে।সারাদিন কাজ করেও সংসার চলে না। আমাদের থাকার জায়গা নেই। আজ এখানে, কাল অন্য জায়গায়—এইভাবেই জীবন কাটছে।”
মিরুখালী রোডের কমল দাস ও শতীস দাস জানায়,শিক্ষার আলো জ্বলছে, কিন্তু সুযোগের দরজা বন্ধ
দারিদ্র্য ও সামাজিক বাধা সত্ত্বেও হরিজন সম্প্রদায়ের কয়েকজন তরুণ উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন অনিতা রানী দাস (স্নাতক), গৌতম দাস (এইচএসসি), জীবন দাস ও মিঠু দাস (স্নাতক অধ্যয়নরত), আকাশ দাস (কৃষি ডিপ্লোমা) এবং স্বজল দাস (ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং)।
তবে শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ায় হতাশা বাড়ছে তরুণদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ—যোগ্যতার চেয়ে সামাজিক পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ঝুঁকি
স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণেও রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য এবং সামাজিক দূরত্বের কারণে অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না। দলিত নারীরা বিশেষভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকার কথা থাকলেও অনেক পরিবার সেই সুবিধা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আকলিমা আক্তার জানান,
“দলিত (হরিজন) সম্প্রদায়ের আবাসন সমস্যার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে আবেদন পাওয়া গেলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।”
প্রশ্ন রয়ে গেল
মুচিবাড়ীর বিলুপ্তি শুধু একটি বসতির হারিয়ে যাওয়া নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সমান নাগরিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
একসময় সমাজের প্রয়োজন মেটানো মানুষগুলো আজ নিজেরাই টিকে থাকার লড়াইয়ে। প্রশ্ন উঠছে—
পেশার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এই জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে কি পর্যাপ্ত পরিকল্পনা আছে?
নাকি তারা ধীরে ধীরে ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে যাবে?
সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই নীরব সংকটের সমাধান সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
Leave a Reply