মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে আনন্দময়, আবার সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়গুলোর একটি। প্রতিটি মা-বাবারই স্বপ্ন থাকে সুস্থ একটি শিশুকে নিরাপদে পৃথিবীর আলো দেখানোর। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে কখনো কখনো এমন কিছু জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন স্বাভাবিক প্রসবের পরিবর্তে সিজারিয়ান (সিজার) অপারেশনই হয়ে ওঠে মা ও শিশুর জীবন রক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে—সিজার কি সবসময় প্রয়োজন? নাকি এটি এড়িয়ে চলা উচিত? বাস্তবতা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে সিজার কোনো বিকল্প সুবিধা নয়; বরং নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত প্রয়োজনেই এটি করা হয়। যখন স্বাভাবিক প্রসব মা বা শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সিজারই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

পরিকল্পিত সিজার কখন প্রয়োজন?
গর্ভকালীন নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক সময় আগেই বোঝা যায় যে স্বাভাবিক প্রসব নিরাপদ হবে না। তখন চিকিৎসক পরিকল্পিতভাবে সিজারের সিদ্ধান্ত নেন।
এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে অন্যতম হলো প্লাসেন্টা প্রিভিয়া, যেখানে গর্ভফুল জরায়ুর নিচের অংশে অবস্থান করে এবং শিশুর স্বাভাবিক জন্মপথে বাধা সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করলে মায়ের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে।
শিশু যদি ব্রীচ অবস্থানে থাকে, অর্থাৎ মাথার পরিবর্তে নিতম্ব বা পা নিচের দিকে থাকে, কিংবা গর্ভে আড়াআড়ি অবস্থান করে, তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিজার নিরাপদ হয়।
যমজ বা একাধিক সন্তান ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় সিজারের প্রয়োজন হয়, বিশেষ করে প্রথম শিশুটি যদি মাথা নিচের দিকে না থাকে।
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর আকার মায়ের প্রসবপথের তুলনায় বড় হলে স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয় না। তখন মা ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য সিজারই উত্তম বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া মায়ের অতি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মস্তিষ্কের কিছু জটিলতা, অথবা এমন সংক্রমণ (যেমন এইচআইভি বা যৌনাঙ্গের হার্পিস) থাকলে, যা স্বাভাবিক প্রসবের সময় শিশুর মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে, তখনও পরিকল্পিত সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আগের গর্ভধারণে নির্দিষ্ট ধরনের সিজার হয়ে থাকলে পরবর্তী সন্তান প্রসবেও অনেক সময় সিজার প্রয়োজন হতে পারে।
কিছু মা প্রসববেদনার ভয় বা মানসিক উদ্বেগ থেকে সিজার করতে চান। তবে চিকিৎসকেরা সাধারণত কেবল রোগীর ইচ্ছার ভিত্তিতে নয়; বরং বয়স, শারীরিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেন।জরুরি সিজার কখন করতে হয়?
সব গর্ভধারণে আগেভাগে সিজারের প্রয়োজন বোঝা যায় না। অনেক সময় স্বাভাবিক প্রসব শুরু হওয়ার পর হঠাৎ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন দ্রুত সিজার করানো ছাড়া অন্য কোনো নিরাপদ পথ থাকে না।
যদি প্রসবের ব্যথা ঠিকমতো অগ্রসর না হয়, জরায়ুর সংকোচন যথেষ্ট শক্তিশালী না হয় অথবা দীর্ঘ সময়েও প্রসব সম্পন্ন না হয়, তাহলে জরুরি সিজারের প্রয়োজন হতে পারে।
প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন, অর্থাৎ গর্ভফুল সময়ের আগেই জরায়ু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। এ অবস্থায় তীব্র পেটব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং দ্রুত শারীরিক অবনতির কারণে জরুরি সিজার প্রয়োজন হয়।
শিশুর শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিলে বা তার হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় কমে বা বেড়ে গেলে চিকিৎসকেরা এটিকে ফিটাল ডিসট্রেস হিসেবে বিবেচনা করেন। তখন দ্রুত শিশুকে পৃথিবীতে আনা প্রয়োজন হয়।
আবার নাভিরজ্জুতে চাপ পড়লে বা নাভিরজ্জু শিশুর জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে না পারলেও জরুরি সিজারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মায়ের ক্ষেত্রে প্রি-এক্লাম্পসিয়া বা এক্লাম্পসিয়া, অর্থাৎ গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা দেখা দিলে এবং দ্রুত স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব না হলে সিজারই নিরাপদ বিকল্প হয়ে ওঠে।সিজার কি ঝুঁকিমুক্ত?
বর্তমান সময়ে সিজারিয়ান অপারেশন অত্যন্ত নিরাপদ হলেও এটি একটি বড় অস্ত্রোপচার। তাই এর কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে।
মায়ের ক্ষেত্রে অপারেশনের স্থানে সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্ত জমাট বাঁধা, মূত্রথলি বা আশপাশের অঙ্গে আঘাত, অ্যানেস্থেসিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে।
শিশুর ক্ষেত্রেও খুব সামান্য কেটে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ৩৯ সপ্তাহের আগেই সিজার করা হলে নবজাতকের শ্বাসকষ্টের সম্ভাবনা কিছুটা বেড়ে যায়। কিছু গবেষণায় জন্মের প্রথম বছরে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কিছু পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে প্রভাব
একবার সিজার হলেই ভবিষ্যতে অবশ্যই সিজার করতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে পরবর্তী গর্ভধারণে গর্ভফুলের অস্বাভাবিক সংযোগ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা জরায়ুর পুরোনো সেলাইয়ের স্থানে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের পরিকল্পনায় অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।সচেতন সিদ্ধান্তই নিরাপদ মাতৃত্বের চাবিকাঠি
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শুধু ভয়, সামাজিক চাপ বা ভুল ধারণার কারণে সিজার কিংবা স্বাভাবিক প্রসব—কোনোটিই বেছে নেওয়া উচিত নয়। একজন দক্ষ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মায়ের শারীরিক অবস্থা, গর্ভের শিশুর অবস্থান এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করেই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেন।
নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অনেক জটিলতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এতে অপ্রয়োজনীয় সিজার এড়ানো যেমন সম্ভব, তেমনি প্রয়োজনের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মা ও নবজাতকের জীবনও নিরাপদ রাখা যায়।
মনে রাখতে হবে—সন্তান জন্মদানের পদ্ধতি নয়, মা ও শিশুর সুস্থতাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। নিরাপদ মাতৃত্বই হোক প্রতিটি পরিবারের প্রথম অঙ্গীকার।

Leave a Reply