বিষয়: মঠবাড়িয়ার লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘ ১৫ বছরের জলাবদ্ধতা, অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সশ্রদ্ধ সালাম ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
আমি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার একজন সাধারণ নাগরিক। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থও নয়—শুধু লক্ষাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা আপনার দৃষ্টিগোচর করার জন্য বিনয়ের সাথে এই খোলা চিঠি লিখছি।
দক্ষিণ বাংলার বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মাঝখানে অবস্থিত মঠবাড়িয়ার মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা এলাকার ঐতিহাসিক “দোগনা খাল” ও “ভূতা খাল” একসময় এই জনপদের কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল। কিন্তু গত প্রায় দেড় দশক ধরে একাধিক অবৈধ বাঁধ, দখল ও খাল ভরাটের কারণে এই প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে খাল ভরাট করে অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মান ও শাখা খালের মূখে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের বিপর্যয় ঘটেছে।
এর ফল আজ ভয়াবহ। বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকা মাসের পর মাস জলাবদ্ধ থাকে। আবার শুষ্ক মৌসুমে প্রচন্ড পানি সংকটে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। একাধিক বাঁধের কারণে নদীর জোয়ারের পানির চাপে সারা বছর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, মেরামত চলতেই থাকে। হাজার হাজার একর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়েছে, জীবিকা হারিয়েছে অসংখ্য পরিবার। এমনকি মৃত ব্যক্তিদের স্বাভাবিকভাবে দাফন করাও কঠিন হয়ে পড়ে; উঁচু করে কবর নির্মাণ করতে হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এই বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এ সমস্যা নতুন নয়। গত পনেরো বছরে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে অসংখ্য আবেদন করেছে। বহু তদন্ত হয়েছে, পরিদর্শন হয়েছে, অবৈধ বাঁধ অপসারণের সুপারিশ ও নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এমনকি আদালতের নির্দেশনার কথাও আলোচনায় এসেছে। ইলেকট্রোনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় অসংখ্য প্রতিবেদন প্রচার হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
২০২৫ সালের শুরুতে প্রশাসনের উপস্থিতিতে দুই মাসের মধ্যে অবৈধ বাঁধ অপসারণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও আজ বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি বহুবার বলেছেন—রাষ্ট্রের উন্নয়নের মূল লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা। আমরা সেই বিশ্বাস থেকেই আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি। আমাদের এই আর্তি যেন আর কোনো দপ্তরের ফাইলে আটকে না থাকে।
আমাদের বিনীত প্রস্তাব—
১. দোগনা খালের তিনটি অবৈধ বাঁধ জরুরি ভিত্তিতে অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে দুটি ছোট সেতু নির্মাণ।
২. ভূতা খালের দুটি অবৈধ বাঁধ অপসারণ করে খালের মুখে একটি আধুনিক স্লুইসগেট নির্মাণ।
৩. নাপিতবাড়ি খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং প্রয়োজনীয় স্লুইসগেট স্থাপন।
৪. সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা।
৫. খাল দখল ও পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি খাস খাল পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এই আবেদন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। এটি একটি জনপদের বেঁচে থাকার আবেদন। আমরা বিশ্বাস করি, আইনের শাসন ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপনার সরকার দৃঢ় অবস্থান নেবে।
আপনার আন্তরিক হস্তক্ষেপে যদি এই অবৈধ বাঁধগুলো অপসারণ হয়, তাহলে শুধু জলাবদ্ধতার অবসানই হবে না; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, মৎস্যসম্পদ পুনরুদ্ধার হবে, পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং লক্ষাধিক মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বলবে।
আমরা বিশ্বাস করি, একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আপনি এই মানবিক আবেদন বিবেচনা করবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেবেন।
মঠবাড়িয়ার মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়—বাস্তব সমাধান দেখতে চায়।
বিনীত নিবেদক,
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
সাবেক সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব, পিরোজপুর

Leave a Reply