মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
রাজনীতি শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, আদর্শ, ত্যাগ এবং দায়িত্ববোধের এক দীর্ঘ যাত্রা। একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে। সমাজ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয় মানুষদের সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—আদর্শিক রাজনীতিক, সুবিধাবাদী রাজনীতিক এবং নীরব সুসীল শ্রেণি। প্রত্যেকের ভূমিকা, মানসিকতা ও প্রভাব ভিন্ন; আর এই ভিন্নতাই রাজনীতির বাস্তব চিত্রকে স্পষ্ট করে।
প্রথমেই আসে আদর্শিক রাজনীতিকদের কথা। এরা রাজনীতিকে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং বিশ্বাস ও আদর্শের সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের সম্পর্ক আবেগ ও দায়িত্ববোধে গড়া। দলের সুসময় যেমন তারা আনন্দ ভাগ করে নেন, তেমনি দুঃসময়ে দলের পাশে দাঁড়ানোকে তারা নৈতিক দায়িত্ব মনে করেন। হামলা, মামলা, নির্যাতন কিংবা সামাজিক চাপ—কোনো কিছুই তাদের অবস্থান বদলাতে পারে না। তারা পরামর্শ দেন, ভুল হলে সমালোচনা করেন, কিন্তু দল ও আদর্শ ত্যাগ করেন না।
আদর্শিক কর্মীদের শক্তি হলো তাদের স্থিরতা। সময়ের ঝড় যতই প্রবল হোক, তারা নিজেদের বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হন না। তাদের কাছে রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের স্বপ্ন। ইতিহাস সাক্ষী—বড় রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণজাগরণ গড়ে উঠেছে এই আদর্শিক মানুষদের হাত ধরেই। আগুনে পুড়ে যেমন সোনা খাঁটি হয়, তেমনি সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়েই আদর্শিক কর্মীরা দলের প্রকৃত শক্তিতে পরিণত হন। তারা সংখ্যায় কম হলেও দলের ভিত শক্ত করে রাখেন।
অন্যদিকে রয়েছে সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ। এদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আদর্শ নয়, বরং সুযোগ ও স্বার্থ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তারা সহজেই দল পরিবর্তন করেন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সুবিধাবাদীরা সেই দলের আশ্রয়ে যেতে দ্বিধা করেন না। তাদের লক্ষ্য থাকে ব্যক্তিগত অবস্থান শক্ত করা, প্রভাব বৃদ্ধি করা কিংবা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করা।
ক্ষমতাসীন দলগুলো অনেক সময় সংগঠন বড় করার তাগিদে এই সুবিধাবাদীদের কাছে টেনে নেয়। স্বল্প সময়ে দল ভারী হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব সবসময় ইতিবাচক হয় না। কারণ আদর্শবিহীন রাজনীতি সংগঠনের ভিত দুর্বল করে দেয়। সুবিধাবাদীরা সংকটের সময় পাশে থাকে না; বরং পরিস্থিতি প্রতিকূল হলেই নতুন আশ্রয়ের খোঁজে চলে যায়। ফলে দলের ভেতরে বিশ্বাস ও আস্থার সংকট তৈরি হয়।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি রয়েছে—নীরব সুসীল সমাজ। এরা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেন না, মিছিল-মিটিংয়ে সময় দেন না, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন থাকেন। তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দলকে নীরবে সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসী নন। অনিয়ম, দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা দেখলে তারা সমালোচনা করেন, প্রশ্ন তোলেন এবং নৈতিক অবস্থান বজায় রাখেন।
দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই এই সুসীল শ্রেণিকে গুরুত্ব দেয় না। কারণ তারা দৃশ্যমান কর্মী নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থে নেতাদের অনুসরণও করেন না। অথচ একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এই নীরব সচেতন মানুষগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তারা সমাজের বিবেক হিসেবে কাজ করেন। তাদের যুক্তিনির্ভর সমালোচনা রাজনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাস্তবতা হলো—একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এই তিন শ্রেণির মধ্যকার ভারসাম্য জরুরি। আদর্শিক কর্মীরা দলকে নৈতিক ভিত্তি দেয়, সুসীল সমাজ দেয় বিবেকের দিকনির্দেশনা, আর সুবিধাবাদীদের উপস্থিতি রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন সত্যকে মনে করিয়ে দেয়। তবে যখন সুবিধাবাদ প্রাধান্য পায় এবং আদর্শ পিছিয়ে পড়ে, তখন রাজনীতি মানুষের আস্থা হারায়।
রাজনীতি তখনই সুন্দর হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের পথে পরিচালিত হয়। ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু আদর্শ দীর্ঘস্থায়ী। ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে সেই মানুষগুলোই, যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করেছেন।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োজন আত্মসমালোচনা ও মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ। দলগুলো যদি আদর্শিক কর্মীদের মূল্যায়ন করে, সুবিধাবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং সুসীল সমাজের মতামতকে সম্মান জানায়, তবে রাজনীতি আবার মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরে আসতে পারে।
কারণ রাজনীতির প্রকৃত শক্তি সংখ্যায় নয়—বিশ্বাসে, সততায় এবং মানুষের হৃদয়ে।
লেখক ~সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর
Leave a Reply