লেখক ~ কলামিস্ট
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবকিছুই এক অদৃশ্য ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ভারসাম্য যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন প্রকৃতি, সমাজ কিংবা সময় বিভিন্নভাবে সংকেত দিতে থাকে। সেই সংকেত কখনো ক্ষীণ, কখনো প্রবল; কখনো দৃশ্যমান, কখনো নিঃশব্দ। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অবহেলিত ছোট ছোট সংকেতই একসময় বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই অশনি সংকেতকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ অশনি সংকেতই ভবিষ্যতের বার্তাবাহক।
কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। অতিরিক্ত ভিটামিন যেমন শরীরের ক্ষতি করে, তেমনি অতিরিক্ত ক্ষমতা, অতিরিক্ত লোভ কিংবা অতিরিক্ত অহংকার সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে। পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসের একটি সীমা আছে। সীমা অতিক্রম করলেই ভারসাম্য নষ্ট হয়, আর ভারসাম্য নষ্ট হলেই শুরু হয় অস্থিরতা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রেই এই সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
মানুষকে তার সঙ্গী দিয়ে চেনা যায়—এই প্রবাদটি আজও বাস্তব। সমাজে যখন অসৎ মানুষের প্রভাব বাড়তে থাকে, যখন সত্যের চেয়ে তোষামোদ বেশি মূল্য পায়, যখন নীতির চেয়ে সুবিধাবাদ বড় হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে সমাজে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে। এটি নিছক একটি পরিবর্তন নয়; এটি একটি অশনি সংকেত। কারণ নৈতিকতা হারিয়ে গেলে সভ্যতার বাহ্যিক চাকচিক্য থাকলেও ভিতরে ভিতরে সমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
বিরামচিহ্নের যেমন সঠিক ব্যবহার রয়েছে, তেমনি বিরামচিহ্নহীন লেখার ভয়াবহতাও রয়েছে। একটি ছোট কমা যেমন বাক্যের অর্থ পাল্টে দিতে পারে, তেমনি সমাজে ছোট ছোট অনিয়মও একসময় বড় সংকটের জন্ম দেয়। আমরা অনেক সময় ভাবি—“এতে আর কী হবে?” কিন্তু ইতিহাস বলে, অবহেলিত অন্যায়ই একসময় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে। ছোট দুর্নীতি বড় দুর্নীতির জন্ম দেয়, ছোট মিথ্যা বড় প্রতারণার পথ তৈরি করে, ছোট অবিচার একসময় গণঅসন্তোষে রূপ নেয়।

বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে তাকালে নানা ধরনের অস্বস্তিকর চিত্র চোখে পড়ে। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অবক্ষয়—সব মিলিয়ে এক ধরনের অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা অতিক্রম করছি। সাধারণ মানুষ আজ শান্তি চায়, নিরাপত্তা চায়, সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু তাদের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা ও বঞ্চনার কথা অনেক সময় ক্ষমতার করিডোর পর্যন্ত পৌঁছায় না। জনগণের দীর্ঘশ্বাস যখন উপেক্ষিত হয়, তখন সেটিও এক ধরনের অশনি সংকেত হয়ে ওঠে।
মানুষ মূলত শান্তির পূজারী। কোনো মানুষ অশান্তি চায় না। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই চায় সমাজ ও দেশ ভালো থাকুক। কিন্তু যখন রাজনৈতিক স্বার্থ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে প্রভাবিত করে, যখন ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মানুষের মনে ক্ষোভ জন্ম নেয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ প্রতিবাদ করবেই। কারণ প্রতিবাদ মানুষের সহজাত অধিকার। ইতিহাসে যত বড় পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে সাধারণ মানুষের নীরব কষ্ট ও জমে থাকা ক্ষোভই ছিল মূল শক্তি।
প্রকৃতির নিয়মই হলো পরিবর্তন। কোনো কিছু স্থায়ী নয়। সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। যে সমাজ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না, যে রাষ্ট্র জনগণের কণ্ঠস্বর শুনতে চায় না, যে নেতৃত্ব আত্মসমালোচনায় বিশ্বাস করে না—সেই সমাজ ও রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সংকটের দিকে এগিয়ে যায়। তাই অশনি সংকেতকে ভয় না পেয়ে তা থেকে শিক্ষা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
আজ প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও দেশের স্বার্থ যেন সবার আগে থাকে। কারণ রাষ্ট্র টিকে থাকে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার ওপর। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজের প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি অবিচার, প্রতিটি অসঙ্গতি কোনো না কোনো ভবিষ্যৎ বিপদের পূর্বাভাস বহন করে। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া জরুরি। ছোট সমস্যাকে ছোট ভেবে উপেক্ষা করলে একসময় সেটিই বড় দুর্যোগ হয়ে ফিরে আসে। যে জাতি সময়ের সংকেত বুঝতে পারে, সেই জাতিই টিকে থাকে এবং উন্নতির পথে এগিয়ে যায়।
অশনি সংকেত মানেই কেবল ভয় নয়; এটি সতর্কবার্তাও। এটি আমাদের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেয়, আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়, নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। সংকেতকে বুঝে যদি আমরা দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ আরও সুন্দর হতে পারে। অন্যথায় ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।
সবশেষে বলতে হয়, দেশের সাধারণ মানুষের আশা খুব সামান্য—তারা শান্তিতে বাঁচতে চায়, নিরাপদে চলতে চায়, সম্মান নিয়ে জীবন কাটাতে চায়। তাদের কষ্টকে অনুভব করা, তাদের কথাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদের স্বপ্নকে সম্মান করাই একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। কারণ জনগণের কান্না কখনো বৃথা যায় না। সময়ের দেয়ালে লেখা অশনি সংকেতগুলোই একদিন ভবিষ্যতের কঠিন বাস্তবতায় রূপ নেয়।

Leave a Reply