প্রতিবেদক : মুফতি ইব্রাহিম কামাল শিক্ষক গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা, টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসারে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করছে, তার মধ্যে অন্যতম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা। প্রায় আট দশকের বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি শুদ্ধ দ্বীনি শিক্ষা ও দেশপ্রেমের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করে চলেছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও পটভূমি
১৯৩৮ সালে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, মুজাহিদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ছদর সাহেব হুজুর-এর হাত ধরে এই মাদ্রাসার যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে পিছিয়ে পড়া এই জনপদে শিক্ষার আলো ছড়াতে তিনি নিজ গ্রামে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। দেওবন্দি ধারার এই মাদ্রাসাটি শুরু থেকেই কেবল কিতাবি শিক্ষা নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মানদণ্ড বিচারে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হয়।
শিক্ষা ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি:
গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসার ঐতিহ্যের মূলে রয়েছে এর সুশৃঙ্খল পরিবেশ এবং যুগোপযোগী শিক্ষা পদ্ধতি। মাদ্রাসাটির উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য হলো:
শিক্ষা ধারা: এখানে নুরানী ক্বিরাআত বিভাগ, হিফজুল কুরআন বিভাগ, জামায়াত বিভাগ ইবতিদাইয়াহ থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, যা সম্পূর্ণ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাংগা বাংলাদেশ এবং ‘আল হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া’ এর শিক্ষা সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত।
ইহা ছাড়াও রয়েছে ইসলামী আইন শাস্ত্র বিভাগ ও আরবী সাহিত্য বিভাগ।
সমাজ সংস্কার: প্রতিষ্ঠাতা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে এই মাদ্রাসাটি সবসময়ই উগ্রপন্থা বিরোধী এবং সমাজ সংস্কারমূলক কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশাল পাঠাগার: এখানে রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক এবং দুষ্প্রাপ্য কিতাবের এক বিশাল সংগ্রহশালা, যা গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটায়।
অসাম্প্রদায়িক চেতনা: বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে অবস্থিত হওয়ায় এই মাদ্রাসার সাথে স্থানীয় সামাজিক বন্ধন অত্যন্ত সুদৃঢ়।
বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব:
বর্তমানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এই মাদ্রাসা থেকে ইলমে দ্বীন শিক্ষা গ্রহণ করছে। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে হাজারো আলেম আজ দেশ-বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত এবং আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। মাদ্রাসার বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষক মণ্ডলী পূর্বসূরিদের আদর্শ ধরে রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
“গওহরডাঙ্গা কেবল একটি মাদ্রাসা নয়, এটি একটি আদর্শিক বিপ্লবের নাম। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্ররা সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন।”
দক্ষিণবঙ্গের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা তার স্বকীয়তা বজায় রেখে আগামীর পথে এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর।
Leave a Reply