1. admin@deshbanglakhabor.com : admin :
  2. e.mominbd@gmail.com : MOMIN :
  3. samira01606@gmail.com : SAMIRA : Sumaya Samira
  4. farhanaenterprise18@gmail.com : SHOFIKUL :
       
বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১২ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
নীলফামারীতে মাছ ধরতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু মোহাম্মদপুরে কৃষি প্রনোদনা বিতরণ নিজ মাতৃভূমিতেই আমরা কেন নিরাপদ নই?নিরাপত্তাহীনতার বেদনায় রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের আত্মজিজ্ঞাসা রাণীনগর ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত কাশিয়ানীতে ‘স্বপ্নছোঁয়া’ ফ্যাশন হাউজে আলফাডাঙ্গা’র গণমাধ্যমকর্মীদের আড্ডা ও কেনাকাটা এম.এ খালেক মহাবিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন সরদার মোঃ নুরুজ্জামান মোরেলগঞ্জে আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬ অনুষ্ঠিত কাশিয়ানীর মহেশপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই যুবকের মৃত্যু। মহাম্মদপুর বিএনপি’র একাংশের বিভিন্ন দপ্তরের চাঁদাবাজির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ। মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব—তবু কখনো কেন পশুকেও হার মানায়?

মঠবাড়িয়ায় ভূয়া চিকিৎসার আদ্যোপান্ত: স্বাস্থ্য বিভাগের দায়হীনতা

  • প্রকাশিত সময় : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬
  • ১০৮ বার পড়েছেন

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ

মফস্বলের মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যায় জীবন বাঁচানোর আশায়। একজন চিকিৎসক, একটি হাসপাতাল কিংবা একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার—এগুলো শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। কিন্তু সেই ভরসার জায়গাগুলোই যদি প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়, অদক্ষতা আর অনিয়মের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়?
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া যেন আজ “ক্লিনিকের শহর”। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনেসহ শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল কেয়ার, চক্ষু চিকিৎসালয় ও কথিত ডাক্তারি প্রতিষ্ঠান। বাহ্যিক চাকচিক্য, বড় বড় সাইনবোর্ড, চটকদার ব্যানার আর ভিজিটিং কার্ডে বিশেষজ্ঞ পরিচয়ের ছড়াছড়ি থাকলেও বাস্তবতা ভয়াবহ। কোথাও ডাক্তার নেই, কোথাও ভুয়া সনদধারী ব্যক্তি চিকিৎসা দিচ্ছেন, আবার কোথাও অদক্ষ হাতে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
১৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার স্বাক্ষরে ১৫ জন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টকে দাঁতের চিকিৎসার নির্দিষ্ট পরিধির আওতায় রোগী দেখার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে ৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়। কমিটির ৫ জন সদস্যই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা। উদ্দেশ্য ছিল বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডেন্টাল কেয়ারের কার্যক্রম তদারকি করা এবং স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
এরপর ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ৭১ টিভির এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মঠবাড়িয়ার ৭টি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। সেখানে নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়।
২৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে পিরোজপুরের সিভিল সার্জন একটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার-এর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধের জন্য ব্যবস্হা গ্রহন করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বন্ধের নির্দেশনার পরও কিভাবে প্রতিষ্ঠান অদৃশ্য শক্তির ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে চলতে থাকে?
২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে ঐ হাসপাতালের সিজারিয়ান অপারেশনের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া আসমা বেগমের ছেলে কলেজছাত্র মো. ফোরকান আদালতে মনির হোসেনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।বিষয়টি ২৮/১০/২০২৫ দৈনিক গণকণ্ঠ এবং ২৯/১০/২০২৫ দৈনিক সময়ের কণ্ঠে প্রকাশিত হলে জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।

০৫ মে ২০২৬ তারিখে একটি চিঠির মাধ্যমে ১৫ দিনের মধ্যে অনুমতি প্রাপ্ত ১৫ জন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের সনদের বৈধতা প্রমাণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ব্যর্থতায় ব্যবস্হা গ্রহন।
এখানেই প্রশ্নের জন্ম হয়—এই ১৫ জনকে অনুমতি দেওয়ার আগে কি আদৌ তাদের সনদ যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল? যদি যথাযথ যাচাই হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে ভুয়া সনদ উদঘাটিত হলো কীভাবে? আর যদি যাচাই না হয়ে থাকে, তবে সেই দায় কার?
এই প্রশ্নগুলো এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে—
১। ১৫ জনের তথ্যাদি কি যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল?
২। বাকি ১৪ জনের সনদ ও তথ্যাদি পুনরায় যাচাই করা হবে কি?
৩। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিদর্শন কমিটিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৫ জন কর্মকর্তাকে সদস্য করার আইনগত ভিত্তি কী?
৪। মঠবাড়িয়ায় যেখানে বিডিএস ও আইএইচটি ডিপ্লোমাধারী ৭ জনের বেশি বৈধ দন্তচিকিৎসক রয়েছেন, সেখানে আরও ১৫ জনকে অনুমতি দেওয়ার প্রয়োজন কেন দেখা দিল?
১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সাফা বাজারের একটি সার্জিক্যাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে নোয়াখালীর ভুয়া চিকিৎসক পি.সি বর্মনকে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইনে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ক্লিনিক মালিক মনির হোসেনকেও জরিমানা ও স্বল্পমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে নিজেকে হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ পরিচয় দেওয়া বগুড়ার ভুয়া চিকিৎসক শুভাস চন্দ্র মোহন্ত ওরফে “ডাঃ নুরুল ইসলাম”/“ডাঃ লিয়াকত আলী”-কে আটক করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন একাধিক ভুয়া পরিচয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন।
২৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় অনুমতিপ্রাপ্ত একজন ডেন্টাল টেকনোলজিস্টকে “ডাক্তার” শব্দ ব্যবহার করার অপরাধে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং তার ভুয়া সনদের বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে। প্রশ্ন হলো—শুধু “ডাক্তার” লিখলে যদি বড় অঙ্কের জরিমানা হয়, তাহলে ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়ার শাস্তি কী হওয়া উচিত?
এদিকে ৪ মে ২০২৬ তারিখে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল “সময় টিভি”-তে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে মঠবাড়িয়া হাসপাতালের আশপাশে দালালচক্রের সক্রিয়তা, অনিয়ম এবং ভুয়া চিকিৎসা কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবার নামে গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত চিকিৎসা না থাকায় রোগীরা প্রতারিত হচ্ছেন এবং জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।


১২ মে ২০২৬ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাংবাদিক ও বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাকিল সরোয়ার। সেখানে তিনি নিজের অর্থে জনস্বার্থে বিভিন্ন কাজ করার দাবি তুলে ধরেন। একইসঙ্গে অভিযোগ করেন, একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—তার নাকের ডগায় যদি ভুয়া ডাক্তার, অবৈধ ক্লিনিক, অদক্ষ টেকনিশিয়ান এবং অনিয়মে ভরা চিকিৎসাব্যবস্থা চলতে থাকে, তবে সেগুলো কি তার দৃষ্টির বাইরে?
১৬ মে ২০২৬ তারিখ শনিবার সকাল ১১.১৭ ঘটিকায় সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ মতিউর রহমান বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। অনিয়ম হলে তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে তিনি বারবার উত্তর এড়িয়ে যান এবং পরে জানাবেন বলে আশ্বাস দেন।
একই দিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি বিভাগে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার গাড়িচালক বেল্লাল হোসেনকে রোগীদের পরীক্ষার ফি নেওয়া এবং সিবিসি (CBC) রিপোর্ট তৈরি করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রশিক্ষণ বা অনুমোদন ছাড়াই তিনি প্যাথলজির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি রোগীর জীবনের সঙ্গে সরাসরি খেলা। ভুল রিপোর্ট মানে ভুল চিকিৎসা, আর ভুল চিকিৎসা মানেই মৃত্যুঝুঁকি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না; সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন—একটি হাসপাতালের ভেতরে দিনের পর দিন এমন কার্যক্রম চললে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ কীভাবে তা জানেন না?
১৬ মে ২৬ শনিবার ডাঃ সাকিল সরোয়ার জানান, বেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্রহন করা হয়েছে এবং টেকনোলজিস্টদের সনদের বৈধতা প্রমানে ব্যর্থ হলে ব্যবস্হা গ্রহন করা হবে।

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মঠবাড়িয়ার স্বাস্থ্যখাতের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের জমে ওঠা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দায়হীনতার ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। অপারেশনের আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা, অদক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান, ভুয়া পরিচয়ে রোগী দেখা, বাইরে থেকে এনে অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিদের বিশেষজ্ঞ সাজানো—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাত যেন এক নীরব মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ এসব প্রতারণার শিকার হলেও অনেক সময় বুঝতেই পারেন না কে প্রকৃত ডাক্তার আর কে ভুয়া। বড় বড় ডিগ্রির নাম, চটকদার বিজ্ঞাপন আর সাদা অ্যাপ্রোনের আড়ালে প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছেন অসহায় রোগীরা।
জনস্বার্থে মঠবাড়িয়া উপজেলার সব বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডেন্টাল কেয়ার ও চক্ষু চিকিৎসালয়ে কর্মরত ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের সনদপত্র জরুরি ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এই অনিয়ম থামবে না।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কারও থাকার কথা নয়। মঠবাড়িয়ার মানুষ চিকিৎসা চান, প্রতারণা নয়; নিরাপত্তা চান, মৃত্যুফাঁদ নয়।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই জাতীয় আরো খবর