মোঃ জোনায়েদ হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
জীবিকার সন্ধানে সাত বছর আগে স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের পূর্ব কাতিয়ারচর এলাকার যুবক শাকিল মিয়া (২৮)।
পরিবারের দারিদ্র্য ঘুচিয়ে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া এই তরুণ শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরলেন, তবে জীবিত নয়—লাশ হয়ে।
তার অকাল মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
দেশে ফেরা ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (১২ জুন) রাত ১২টার দিকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে শাকিলের মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
শনিবার (১৩ জুন) ভোর ৫টার দিকে মরদেহটি তার কিশোরগঞ্জের নিজ বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রিয়জনকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য বাড়িতে ভিড় করেন শত শত শোকাহত মানুষ।
আকামা জটিলতা ও কারাবাস
নিহতের চাচা ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বুকুল জানান, ২০১৯ সালে সংসারের অভাব দূর করতে প্রায় চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ঢাকার বনানী এলাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান শাকিল।
সেখানে কর্মরত অবস্থায় নিয়োগকর্তার সঙ্গে আকামা সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন তিনি। একপর্যায়ে কর্মস্থল পরিবর্তন করে অন্যত্র কাজ করতে গিয়ে সৌদি পুলিশের হাতে আটক হন এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
শেষ আর্তনাদ ও মর্মান্তিক মৃত্যু
পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকার সময় শাকিলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
মায়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনে শাকিল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি খুব কষ্টে আছি।
শরীর একদম শুকিয়ে গেছে। জেলের খাবার খেতে পারি না। আমাকে যেকোনোভাবে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করো।”
নিহতের স্বজনরা জানান, গত ১৫ মে কারাগারের ভেতরে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিস্ফোরিত হয়।
এ সময় ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে শাকিলের মৃত্যু হয় বলে তারা জানতে পারেন।
মৃত্যুর প্রায় ১০ দিন আগে শেষবার কথা বলার সময়ও শাকিল জামিন ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অর্থের সংকটের কথা জানিয়েছিলেন।
তার মুক্তির জন্য পরিবার কষ্ট করে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা সৌদিতে আইনজীবীর কাছে পাঠিয়েছিল।
সরকারি উদ্যোগে মরদেহ দেশে ফেরা
কারাগারে মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ৮ হাজার সৌদি রিয়াল ব্যয়ের কথা জানানো হলে বিপাকে পড়ে শাকিলের দরিদ্র পরিবার। বিষয়টি কিশোরগঞ্জ জেলা যুবদলের সভাপতি জিএস খসরুজ্জামান শরীফের নজরে এলে তিনি কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমকে বিষয়টি অবহিত করেন। প্রতিমন্ত্রীর উদ্যোগ ও সরকারি সহযোগিতায় শাকিলের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।
শাকিলের বাবা ওমর ফারুক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটি ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
তার আয়ের ওপরই পুরো সংসার চলত। এখন আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারের কাছে পরিবারের জন্য সহযোগিতা চাই।”
শাকিলের এই মৃত্যুতে পূর্ব কাতিয়ারচরসহ পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে। স্থানীয়রা বিদেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply