মঠবাড়িয়া, পিরোজপুর থেকে
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের প্রশাসনিক সংকট চলছে। উপজেলার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদটি দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার মাধ্যমে কাজ চালানো। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঠবাড়িয়ায় বর্তমানে ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৭টি মাদ্রাসা এবং ৩টি কলেজসহ মোট ২৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারপ্রাপ্ত প্রধানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলায় এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট সংখ্যা ১১৩টি।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন স্থায়ী প্রধান না থাকলে প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরি হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধানরা দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক বিষয় নিষ্পত্তি এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। অন্যদিকে, বারবার অ্যাডহক কমিটি গঠনের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ভান্ডারিয়া উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল থেকে মঠবাড়িয়ায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। পরে ২০২৬ সালের ১২ জুলাই তাকে মঠবাড়িয়ার স্থায়ী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও ১৫ জুলাই পর্যন্ত তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী সপ্তাহে তিনি যোগদান করতে পারেন।
এদিকে, উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মোঃ নজরুল ইসলাম সীমিত জনবল ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরেও শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তিনি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ট্রেজারি থেকে গ্রহণ, প্রশ্নপত্র বাছাই, নকলমুক্ত পরীক্ষা পরিচালনা, জাতীয় দিবসের কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি একজন সফল স্কাউটার, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের লাইফ মেম্বার এবং ইংরেজি ভাষার প্রশিক্ষক ও সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁর এই ভূমিকার কারণে অনেক প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রয়েছে।
তবে শিক্ষা প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুরো ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়। স্থায়ী নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত না হলে শিক্ষাব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন কঠিন।
গুলিশাখালি জি কে ইউনিয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নূর হোসেন মোল্লা বলেন, “দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক—উভয় ক্ষেত্রেই নানামুখী সমস্যা দেখা দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন, শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। শিক্ষার স্বার্থে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে ১৫ জুলাই বুধবার সন্ধ্যা ৮টার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিষয়ে তিনি বলেন, “এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষ থেকে শিক্ষক দেবে।” পরে শিক্ষা প্রশাসনের অন্যান্য সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং অসুস্থতার কথা জানিয়ে আলাপ শেষ করেন। যদিও কথোপকথনের শুরুতে তিনি নিজেকে সুস্থ আছেন বলে দাবি করেছিলেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন প্রধানের পদ শূন্য থাকা শিক্ষার মান, জবাবদিহি ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী শিক্ষা প্রশাসন না থাকলে সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়ন, তদারকি এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দ্রুত শূন্য পদে যোগ্য প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, নিয়মিত পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসন না হলে এর বিরূপ প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার ওপর পড়বে।

Leave a Reply