মোঃ জুনায়েদ হোসেন জুয়েল,
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে নিভে গেছে একটি সুখী পরিবারের তিনটি প্রাণ। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছেন জনপ্রিয় কোচিং শিক্ষক মনির হোসেন (৩৭), তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার (৩০) এবং তাদের একমাত্র ছেলে মুহাম্মদ আয়ান (১০)। এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় থেমে গেল একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ।
সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় অষ্টগ্রাম উপজেলার অলোয়েদার সড়কের ভাতশালা সেতু এলাকায় এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটে। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহত মনির হোসেন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার মহিষারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কিশোরগঞ্জ শহরের পরিচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘উচ্ছ্বাস কোচিং সেন্টার’-সহ একাধিক কোচিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় একজন শিক্ষক। সবার মুখে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মনির স্যার’ নামে। তার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে পড়েছেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার বিকেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে অষ্টগ্রাম থেকে মোটরসাইকেলে নিজ বাড়ি মিঠামইনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মনির হোসেন। পথে ভাতশালা সেতুর কাছে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষটি ছিল এতটাই ভয়াবহ যে মোটরসাইকেলটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান মনির হোসেন, তার স্ত্রী মুন্নি আক্তার ও ছোট্ট আয়ান। স্থানীয়রা ছুটে এসে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর পিকআপ ভ্যানটি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে স্থানীয় জনতা ধাওয়া দিয়ে সেটি আটক করতে সক্ষম হন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়িটি জব্দ করে এবং চালককে থানায় নিয়ে যায়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে মহিষারকান্দি গ্রামে নেমে আসে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানান, সকালে হাসিমুখে পরিবার নিয়ে বের হওয়া মানুষটির এমন নির্মম পরিণতি কেউ কল্পনাও করেননি।
মনির স্যারের মৃত্যুর খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের বার্তা দিচ্ছেন তার অসংখ্য শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষী। অনেকেই লিখেছেন, কিশোরগঞ্জ হারালো একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক ও একজন মানবিক মানুষকে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সড়কে বেপরোয়া যান চলাচল ও অতিরিক্ত গতির কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণহানি। তারা দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে নজরদারি বৃদ্ধি এবং চালকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
একটি দুর্ঘটনা শুধু তিনটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, ধ্বংস করেছে একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন। মনির স্যার, তার স্ত্রী ও ছোট্ট আয়ানের এমন করুণ মৃত্যুতে শোকাহত পুরো কিশোরগঞ্জ।

Leave a Reply