লেখক ~সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ।
দেশে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে আগাম নানা আলোচনা এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন প্রত্যাশার আবহ তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও ভোটার—সবাই ধীরে ধীরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। এমন সময়ে নির্বাচনী প্রচারণা, প্রতিশ্রুতি কিংবা রাজনৈতিক কৌশলের পাশাপাশি একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত—সেটি হলো ভদ্রতা, বিনয় ও মানবিক আচরণ।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এখানে চূড়ান্ত ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা যখন ভোটারের দ্বারে দ্বারে যান, তখন তাঁরা শুধু একটি ভোট চান না; তাঁরা মানুষের বিশ্বাস, আস্থা ও ভালোবাসাও অর্জনের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের মন জয় করা যায় কী দিয়ে? অর্থ, প্রভাব, পদ-পদবি কিংবা জাঁকজমক দিয়ে? নাকি বিনয়, ভদ্রতা ও মানবিক আচরণ দিয়ে?
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, মানুষের হৃদয়ের দরজা খোলে সুন্দর ব্যবহারে। একটি আন্তরিক হাসি, সম্মান দিয়ে কুশল বিনিময়, অসুস্থতার খোঁজ নেওয়া, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো কিংবা কোনো স্বার্থ ছাড়া মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা—এসবই একজন নেতাকে মানুষের কাছে আপন করে তোলে। ভোটের সময় নয়, সারা বছর যিনি মানুষের পাশে থাকেন, মানুষও তাঁকে সহজে ভুলে যায় না।
ভোটের মাঠে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ কেউ নিজেদের চারপাশে এমন এক দূরত্ব তৈরি করেন, যেন তাঁরা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। গম্ভীর মুখ, কঠিন ভাষা, অহংকারপূর্ণ আচরণ এবং কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব দিয়ে হয়তো সাময়িক প্রভাব সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। কারণ মানুষ ক্ষমতার ভয় নয়, আন্তরিকতার টানেই কাছে আসে।
হাসিমুখে কথা বলা নিছক একটি অভ্যাস নয়; এটি এক ধরনের মানসিক পরিপক্বতা। যে মানুষ অন্যকে সম্মান করতে জানে, সে নিজেও সম্মান পায়। আর এই সম্মান কোনো পোস্টার, ব্যানার কিংবা মাইকের শব্দে অর্জিত হয় না; অর্জিত হয় চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে।
বর্তমান সমাজে মানুষ বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে ব্যক্তিত্বকে বেশি মূল্যায়ন করে। অনেকেই নামের আগে “কর্নেল”, “আলহাজ”, “লায়ন” অথবা নামের শেষে দীর্ঘ শিক্ষাগত ডিগ্রি ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এসব পরিচয়ের নিজস্ব মূল্য থাকলেও নির্বাচনের মাঠে এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষের সততা, দায়বদ্ধতা ও জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ। ভোটার ব্যালট দেওয়ার সময় উপাধি দেখে নয়, মানুষটিকে বিচার করেই সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক-এর জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি ছিল তাঁর জনসেবা, প্রজ্ঞা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি হয় কর্ম, সততা ও মানবিকতার মাধ্যমে—বাহ্যিক পরিচয়ের মাধ্যমে নয়।
শোভন মার্জিত ভদ্র আচরণও এক ধরনের শিল্প। এই শিল্প কেবল বই পড়ে অর্জন করা যায় না; বরং এটি গড়ে ওঠে পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আত্মসংযম এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক সম্মানবোধের সমন্বয়ে। সুন্দর ও মার্জিত আচরণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমায়, ভুল বোঝাবুঝি দূর করে এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের দৃঢ় সেতুবন্ধন তৈরি করে। নির্বাচনের সময় এই গুণ একজন প্রার্থীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে ওঠে, কারণ মানুষ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রার্থীর ব্যবহার, বিনয় ও মানবিকতাকেও মূল্যায়ন করে। বিনয় এমন এক মহৎ গুণ, যা কোনো বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে শেখানো যায় না; এর সূচনা হয় পরিবারে। একজন শিশুর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক তাঁর বাবা-মা। তাঁদের সততা, ন্যায়বোধ, মানবিকতা, অন্যের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষাই একজন মানুষকে সৎ, বিনয়ী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই সুন্দর আচরণ ও বিনয় কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং একজন যোগ্য নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন অনেক নেতা আছেন, যাঁরা নির্বাচনের সময় কর্মীদের কাঁধে ভর করে এগিয়ে যান, কিন্তু সংকটের দিনে তাঁদের খোঁজও নেন না। কর্মীদের শুধু প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করে পরে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয় সুদিনে নয়, দুর্দিনে প্রকাশ পায়। যে নেতা বিপদের দিনে কর্মী ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ান, তিনিই দীর্ঘদিন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন।
রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণের জন্য হয়, তবে সেখানে ভদ্রতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান অপরিহার্য। প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু শত্রু হিসেবে নয়। কটূক্তি, বিদ্বেষ, অহংকার ও ব্যক্তিগত আক্রমণ গণতন্ত্রকে দুর্বল করে; আর শালীনতা, যুক্তি ও সৌজন্য গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
আজকের ভোটার আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি শোনেন না; প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, ব্যবহার, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বিবেচনা করেন। তাই নির্বাচনের সবচেয়ে কার্যকর প্রচারণা ব্যয়বহুল পোস্টার নয়; সবচেয়ে বড় প্রচারণা হলো একজন মানুষের সুন্দর আচরণ।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, পদও একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ভদ্রতা, মানবিকতা ও সততার মাধ্যমে অর্জিত মানুষের ভালোবাসা কখনো মুছে যায় না। আসন্ন উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন হোক সৌজন্য, শালীনতা ও মানবিক রাজনীতির এক নতুন দৃষ্টান্ত। কারণ শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়, কিন্তু একজন নেতার সুন্দর ব্যবহার মানুষের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকে।

Leave a Reply