হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম: ২০-১০-২০২৬
কুড়িগ্রামের উলিপুরে বড় ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসে নাতির ধারালো চুরির আঘাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন ছোট ভাই মোকছেদ আলী ওরফে বাচ্চু মিয়া (৬৭)। গতকাল রাত আনুমানিক ১টার সময় ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে গলা ও দুই পা কেটে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অভিযুক্ত নাতি রাব্বি মিয়া (২০) পলাতক রয়েছে।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ অক্টোবর মোকছেদ আলী ওরফে বাচ্চু মিয়া রংপুরের মাহিগঞ্জ উপজেলার নব্দীগঞ্জ কলাবাড়ি থেকে উলিপুরের ধরণীবাড়ি ইউনিয়নের কিসামত মধুপুর খামার গ্রামে ছোট বোন মাজেদার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সেখানে একরাত থাকার পর গতকাল (১৯ অক্টোবর) একই গ্রামের পন্ডিতপাড়ায় বড় ভাই একাব্বর আলীর (৭৫) বাড়িতে বেড়াতে আসেন। একই দিনে একাব্বর আলীর ঢাকায় কর্মরত ছেলে মিঠু মিয়ার পূত্র রাব্বি মিয়া গাজিপুর থেকে দাদুর বাড়িতে বেড়াতে আসে। রাত ১০টার দিকে খাওয়া-দাওয়ার পর ছোট দাদু বাচ্চু মিয়া ও নাতি রাব্বি একই ঘরে ঘুমাতে যান। সেখানেই এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটে। বাচ্চু মিয়া মৃত সজর উদ্দিন সরকারের ছেলে।
একাব্বর আলী জানান, রাতে পারিবারিক নানা বিষয়ে আলোচনার পর একই ঘরে ঘুমাতে যান দাদু বাচ্চু মিয়া ও নাতি রাব্বি মিয়া। রাত আনুমানিক ১টার দিকে হঠাৎ রাব্বি ঘর থেকে তার দাদীকে ডাকতে শুরু করে। গভীর রাতে ডাক শুনে একাব্বর আলী ও তার স্ত্রী জেগে ওঠেন। তারা ওই ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পান বিছানায় বাচ্চু মিয়ার একটি পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভয়াবহ এই দৃশ্য দেখে তারা চিৎকার করে রাব্বিকে ঘরের দরজা খুলতে বলেন। দরজা খোলার পর দেখা যায় রাব্বির হাতে কাপড় দিয়ে পেঁচানো একটি রক্তমাখা ধারালো ছুরি। এসময় একাব্বর মিয়া আতঙ্কিত হয়ে প্রতিবেশীদের চিৎকার করে ডাকতে থাকলে সুযোগ বুঝে ঘাতক রাব্বি ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

খবর পেয়ে উলিপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করে। সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতের দুই পা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং গলা আংশিক ঝুলে রয়েছে। পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করেছে। নিহত বাচ্চু মিয়ার বোন মাজেদা বেগম ঘটনাস্থলে এসে মরদেহ শনাক্ত করেন।
একাব্বর আলী আরও জানান, তাদের জমিজমা নিয়ে কোন সমস্যা ছিল না। মাঝে মধ্যে সে বেড়াতে আসতো। তার ছেলে মিঠু মিয়া ঢাকার গাজীপুরে একটি গার্মেন্টেসে কাজ করে। সেখানে একটি বেসরকারি কলেজে এইসএসসিতে পড়াশুনা করে তার নাতি রাব্বি। তিনি স্বীকার করেন তার নাতি রাব্বি মাদকাসক্ত। তবে এভাবে হত্যা করবে এটা তিনি ভাবতেই পারছেন না।
উলিপুর থানার এসআই বাবুল হোসেন বলেন, রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে জাতীয় জরুরি সেবায় ফোন করে হত্যাকাণ্ডের খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতের বড় বোন মাজেদা বেগম মরদেহ শনাক্ত করেন। তাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তবে পরিবারের সবাই পালিয়ে গেছেন।
নিহত বাচ্চু মিয়ার ছেলে মোতালেব হোসেন জানান, এক প্রতিবেশি আমাকে ফোন করে জানায় আমার পিতাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সকালে আমি এখানে আসি। ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকুক আমরা তাদের বিচার চাই।
উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, “ঘটনাটি অত্যন্ত বর্বরোচিত। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। ঘাতক নাতি রাব্বিকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম অভিযানে নেমেছে। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ ও স্তব্ধতা বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে ঘাতক রাব্বিকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
Leave a Reply