হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম:
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় চলতি আমন মৌসুমে তীব্র খরা ও সেচ সংকটের কারণে বিক্ষিপ্তভাবে আমন ধানক্ষেতে মিলিবাগ (ছাতরা) পোকার আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সোনালী স্বপ্নের ফসল নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে প্রাপ্ত বিভিন্ন কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোনো সুফল মিলছে না। উপরন্তু, সংকটকালীন এই মুহূর্তে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) কাছ থেকে মিলছে না কোনো ধরণের সহযোগিতা বা পরামর্শ।
চলতি আমন মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলনও আশানুরূপ হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকে আগাম ধান কর্তন শুরু করেছেন। তবে ভালো ফলনের মাঝেও জেলার ৯টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে আক্রমণ করেছে মিলিবাগ বা ছাতরা পোকাসহ অন্যান্য পোকা। পরিমাপটা কম হলেও জেলার প্রায় দেড় শতাধিক কৃষকের প্রায় ৮ থেকে ১০ হেক্টর জমির আমন ধান বিনষ্ট হয়েছে। কৃষি বিভাগ দমনের কথা বললেও বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে মিলিবাগ পোকার আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের দোরগোড়ায় এখন পর্যন্ত পা পড়েনি মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের। ফলে যেসব ধানে মিলিবাগ আক্রমণ করেছে, সেসব জমির পুরো ক্ষেতেই তা বিস্তার লাভ করছে। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে ধানক্ষেত। এদিকে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া এবং তীব্র খরার কারণে জমিতে প্রয়োজনীয় পানি না থাকায় এই পোকার প্রাদুর্ভাব ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কীটনাশক প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে কৃষকের অভিযোগ।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রাধাবল্লভ এলাকার কৃষক রফিক, লিয়াকত, আমিনুল ও ছফিয়াল অভিযোগ করেন, “আমাদের প্রায় আড়াই বিঘা জমির ধান লালবর্ণ হয়ে পুড়ে যাচ্ছে। পোকার আক্রমণ ঠেকাতে বাজার থেকে চড়া দামে বিভিন্ন কোম্পানির কীটনাশক কিনে এনে বারবার প্রয়োগ করেও মিলছে না কোনো সুফল। জমির পুরোটাই আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।”
পার্শ্ববর্তী উলিপুর উপজেলার দামালখামার গ্রামের কৃষক হযরত আলী ও নবিউল জানান, প্রথমে জমির রাস্তার পাশে অল্প কিছু ধানের থোড়ে আক্রমণ করে। এরপর ধীরে ধীরে পুরো জমিটাই গ্রাস করে। মনে হয় যেন আগুনে পুড়ে গেছে ক্ষেত।
এদিকে সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের চর সারডোব গ্রামের কৃষক জলিল, কবির ও সমশের জানান, এখানে বিক্ষিপ্তভাবে ১০ থেকে ১২ জনের জমির কিছু অংশ পুড়ে গেছে। এখনো কৃষি অফিস থেকে কেউ খোঁজখবর নেয়নি।
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রচণ্ড খরার কারণে জমি শুষ্ক হয়ে যাওয়ায় মিলিবাগ পোকার আক্রমণ হয়। জমিতে পর্যাপ্ত সেচের ব্যবস্থা করে আর্দ্রতা বজায় রাখলে প্রাকৃতিকভাবেই পোকার উপদ্রব দ্রুত কমে আসে। পাশাপাশি মাঠের যেসব গাছ ইতোমধ্যে প্রচণ্ডভাবে আক্রান্ত বা মরে গেছে, সেগুলো শিকড়সহ উপড়ে ফেলে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা মাঠ থেকে দূরে নিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) কৃষিবিদ তানভীর আহমেদ সরকার জানান, মাত্র দেড় থেকে দুই হেক্টর জমিতে মিলিবাগ আক্রান্ত হয়েছে। তবে এই কর্মকর্তার কাছে পুরো জেলার সঠিক তথ্য নেই বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সরেজমিনে কুড়িগ্রাম সদর, রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বিক্ষিপ্তভাবে মিলিবাগ আক্রান্ত হয়ে জমি পুড়ে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রায় ৮-১০ হেক্টর জমিতে এই পোকার আক্রমণ ঘটেছে। এতে প্রায় দেড় শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষিবিদ তানভীর আহমেদ সরকার আরও জানান, “এবারে বৃষ্টিপাত কম, বন্যাও তেমনটা হয়নি। এদিকে কৃষকরা জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দেননি। চলছে খরার প্রকোপ, পাশাপাশি বেলে মাটি ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে মিলিবাগ পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। এর ফলে দেড় থেকে দুই হেক্টর জমিতে মিলিবাগ পোকার আক্রমণ হয়েছে। আমাদের পরামর্শের ফলে সেটি দমন করা সম্ভব হয়েছে। সামনে এই পোকার প্রাদুর্ভাব বাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
Leave a Reply