সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় : চাকরি ছাড়ার ১৫ দিনের আলটিমেটাম দলের
হুমায়ুন কবির সূর্য, কুড়িগ্রাম :
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। সরকারি বিধিবিধান লঙ্ঘন করে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন ৬ জন সরকারি চাকরিজীবী। তাঁদের মধ্যে আহ্বায়ক শামসুজ্জামান হাসু ও সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান মুকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই প্রধান শিক্ষক। এ ছাড়া ঘোষিত কমিটিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই সহকারী শিক্ষক, সরকারি কলেজের এক শিক্ষক ও একজন ব্যাংক কর্মকর্তা রয়েছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের দলীয় পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কুড়িগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে। চাকরি ছেড়ে দল করা অথবা পদত্যাগের জন্য ১৫ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে জেলা বিএনপি।
জানা যায়, বুধবার (১৪ অক্টোবর) কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব স্বাক্ষরিত দলীয় প্যাডে ২০ সদস্যবিশিষ্ট ওই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমিটিতে আহ্বায়ক পদে রয়েছেন ফুলবাড়ী উপজেলার রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসু এবং সদস্যসচিব পদে রয়েছেন উপজেলার পূর্ব কুরুষা ফিরুষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুল।
রাতে এই কমিটির তথ্য ফাঁস হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। দলীয় নেতাকর্মীরা পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। এতে দলের শীর্ষ পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়। ফলে জেলা পর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী কর্তৃপক্ষ সাফ জানিয়ে দেয়— দল করতে হলে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে হবে।
এ ছাড়া পশ্চিম কবির মামুদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন, যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল, সরকারি সাইফুর রহমান কলেজের শরীরচর্চা শিক্ষক শাহিনুর রহমান এবং অগ্রণী ব্যাংক ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র অফিসার তহিদুল হককে এই আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় বলেন, “সরকারি চাকরিজীবী হয়ে রাজনৈতিক দলে যোগদান চাকরিবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন ও অসদাচরণ। জড়িতরা অবিলম্বে পদত্যাগ না করলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অভিযুক্ত চার শিক্ষকের কেউ পদত্যাগ করেননি।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি-২৫ (১)-এ বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের অঙ্গ সংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোনোভাবে যুক্ত হতে বা কোনো প্রકારે অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করতে পারবেন না। এর লঙ্ঘন অসদাচরণ বলে গণ্য হবে বলে বিধিমালায় বলা হয়েছে।
এদিকে ২০ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে প্রধান দুই পদসহ ছয়টি পদে ছয়জন সরকারি কর্মচারীকে স্থান দেওয়ায় স্থানীয় বিএনপিতে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এতে সরকারি দায়িত্ব পালনে অবহেলার পাশাপাশি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের আশঙ্কা করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
ঘোষিত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান বলেন, “দুই বছর পর কমিটি দেওয়া হলো। কিন্তু দলীয় গঠনতন্ত্র এবং সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবসহ ছয়জন সরকারি চাকরিজীবীকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। দুঃসময়ে রাজপথে তাঁদের কোনো ভূমিকা ছিল না। তারা চাকরি করেছেন নাকি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন? এখনও তারা চাকরি করবেন নাকি সংগঠন করবেন? এই কমিটি নেতাকর্মীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। দলের ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, “মূলত জেলা আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের আশীর্বাদপুষ্টদের কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।”
এ বিষয়ে ফুলবাড়ী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও রোশন শিমুলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুজ্জামান হাসু বলেন, “আমি ও আমার সদস্যসচিব চাকরি ছেড়ে দেবো। জেলা বিএনপির বেঁধে দেওয়া ১৫ দিন সময়সীমার মধ্যে আমরা সরকারি বিধিবিধান মেনে দল করবো। আপনারা চিন্তা করবেন না, খুব শীঘ্রই চাকরিতে ইস্তফা দেওয়ার কাগজ পেয়ে যাবেন। তবে সরকারি চাকরিজীবী অন্য চারজন কী করবেন সেটা তাঁদের সিদ্ধান্ত।”
তবে এ ব্যাপারে সদস্যসচিব ও অন্য প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান মুকুল তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। তিনি বলেন, “আমি বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলবো।”
সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে দলীয় পদে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল লতিফ বলেন, “বিষয়টি আমি শুনেছি, তবে এখনও কাগজপত্র পাইনি। সরকারি শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।”
কমিটিতে সদস্য পদে স্থান পাওয়া অগ্রণী ব্যাংক ফুলবাড়ী শাখার সিনিয়র অফিসার তহিদুল হক দলীয় পদে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কমিটির সদস্য পদে স্থান পাওয়া যতীন্দ্র নারায়ণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, “আমি অসুস্থ হয়ে ঢাকায় আছি। কমিটিতে কী পদে রাখা হয়েছে আমি জানি না। সুস্থ হয়ে ফিরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।”
অগ্রণী ব্যাংক কুড়িগ্রাম অঞ্চলের প্রধান আহসান হাবিব সরকার বলেন, “প্রবিধান অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দল কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত থাকতে পারবেন না। আমাদের ওই অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “পার্টির গঠনতন্ত্র মোতাবেক সক্রিয় এবং ত্যাগীদের মধ্য থেকে সকলের মতামতের ভিত্তিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিতে যারা স্থান পেয়েছেন তাঁদের দলীয় আদর্শ, নীতি এবং শৃঙ্খলা মান্য করার পাশাপাশি সরকারি বিধিবিধান প্রতিপালন করতে হবে। চাকরিজীবীরা দল করবেন নাকি চাকরি করবেন, তা আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় দল গঠনতন্ত্র মোতাবেক আইনানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
Leave a Reply