সাতক্ষীরা প্রতিনিধি | ১৬ মার্চ, ২০২৬
সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় এক বালতি পানির দাম এখন যেন তেলের চেয়েও দামি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার পাইপলাইনে পানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অকেজো হয়ে পড়েছে ব্যক্তিগত টিউবওয়েলগুলোও। খাবার পানি তো দূরের কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ও শৌচাগার ব্যবহারের পানিটুকু না পেয়ে ৯টি ওয়ার্ডের হাজার হাজার মানুষের জীবন এখন দুর্বিষহ। শহরজুড়ে চলছে পানির জন্য হাহাকার, অথচ পৌর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কেবল ‘অজুহাত’ আর ‘আশ্বাস’-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
শহরের ইটাগাছা, কামলনগর, রসুলপুর, মুনজিতপুর, দক্ষিণ কাটিয়া, লস্করপাড়া ও মাস্টারপাড়া ঘুরে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। গৃহিণীরা খালি কলস আর বালতি নিয়ে পানির সন্ধানে এ-পাড়া ও-পাড়া ছুটছেন। বিশেষ করে ১, ৩, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ।
কাটিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কয়েক মাস ধরে তাঁরা ব্যবহারের পানি পাচ্ছেন না। গোসল ও শৌচাগারের কাজ সারাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ২০-৩০ টাকা দরে প্রতি ড্রাম পানি কিনে আনছেন। মেস ও ছাত্রাবাসগুলোতে থাকা শিক্ষার্থীরা পানির অভাবে রান্না ও গোসল করতে না পেরে শহর ছাড়ার উপক্রম হয়েছে।
সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা হালিমাতুজ সাদিয়া তিক্তকণ্ঠে বলেন, “সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু পানির চিন্তায় থাকতে হয়। কল দিয়ে পানি আসে না, টিউবওয়েলের পানি মুখে তোলা যায় না। আমরা কি কর (ট্যাক্স) দেব শুধু কষ্ট পাওয়ার জন্য?” ভুক্তভোগীরা বলছেন, সাতক্ষীরা পৌরসভা বর্তমানে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছে। সরকারি আমলাতন্ত্রের জালে আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলী নূর খান বলেন, “শহরের অধিকাংশ পুকুর ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধানের কোনো সদিচ্ছা কর্তৃপক্ষের নেই।”
পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখার তথ্য অনুযায়ী:
পৌরসভার ওয়াটার সুপার ও সহকারী প্রকৌশলী নিমাই চন্দ্র বিশ্বাস সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। তিনি বলেন, “ঈদের পরে অকেজো পাম্পগুলো মেরামতের টেন্ডার হয়েছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে দুটি নতুন মোটর স্থাপনের কাজ চলছে, তবে তা সময়সাপেক্ষ।”
তবে তীব্র গরমে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, তখন ‘ঈদের পরে মেরামত’—এমন আশ্বাসকে পরিহাস হিসেবেই দেখছেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয় জলাশয় ও পুকুরগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বিকল্প কোনো উৎসও অবশিষ্ট নেই।
শহরবাসীর দাবি, টেন্ডার আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরিয়ে রেখে জরুরি ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং গভীর নলকূপগুলো দ্রুত সচল করতে হবে। তা না হলে এই হাহাকার অচিরেই বড় ধরনের জনবিক্ষোভে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Leave a Reply